কুসংস্কারেই কি প্রাণ গেলো পাড়া প্রধান ও তার চার ছেলের ?

রুমায় একই পরিবারের পাঁচজনকে হত্যা

বান্দরবানের রুমা উপজেলার গ্যালেংগ্যা ইউনিয়‌নের দুর্গম আবু পাড়ার লোকজনকে মন্ত্রের বানে প্রাণে মেরে ফেলার অভিযোগ তুলে পাড়াপ্রধান ও তার চার ছে‌লে‌সহ পাঁচজনকে কু‌পি‌য়ে হত্যা করেছে পাড়াবাসীরা।

বৃহস্পতিবার (২৪ফেব্রুয়ারী) রাত সাড়ে নয়টার দিকে রুমার গ্যালেংগার ৭নম্বর ওয়া‌র্ডে আবু পাড়ায় এ ঘটনা ঘ‌টেছে।
ঘটনার পর মেরে ফেলা পাঁচটি লাশ পাড়ার পার্শ্ববতী একটি ঝরনার খাদে ফেলে দেয়।

নিহতরা হলেন, আবু পাড়াপ্রধান কারবারী ল‌্যকরুই ম্রো (৬০) ও তার বড় ছে‌লে রুমতুই ম্রো (৪৫), লেনঙি ম্রো (৪২), ‌মেনওয়াই ম্রো (৩৭) ও রিংরাও ম্রো (৩৫)।

নিহতের পরিবারের লোকজন জানায় পাড়া প্রধান লকরুই ম্রোসহ তিন ছেলেকে তাঁর বাড়িতে কুপিয়ে প্রাণে মারা হয়।
সেজ ছেলে মেনঙি কে তাঁর বাড়িতে ওঠে কুপিয়ে মারা হয়।

এহত্যার ঘটনায় পাড়ার প্রতিপক্ষ ১৫ জনের বেশি অংশ নিলেও নিহত স্ত্রী -সন্তানেরা জড়িত থাকা পাঁচজনের নাম বলেছেন। এরা হলেন, রুইতুই ম্রো(৬৩), পালে ম্রো, কাইনপ্রে ম্রো, থংওয়ে ম্রো ও ত্লাসাই ম্রো।

পাড়ার নারীরা জানায়, রুমা উপজেলার গ্যালেঙ্গা ইউনিয়নের আবু পাড়ার পাড়াপ্রধান কারবারীর সাথে স্থানীয়দের মধ্যে জুম দখল নিয়ে বিরোধ চলছিল দীর্ঘদিন ধরে।

পাড়ার লোকজনের দখলীয় যে জমি পছন্দ করত, সেটি জোর করে দখলে নিত। কেউ প্রতিবাদ করলে তাকে মন্ত্রের জাদুর বান মেরে দুনিয়া থেকে সরিয়ে ফেলতো! কাউকে কাউকে প্রাণে না মেরে দিনের পর দিন অসুস্থ করে রাখতে পারে, এমন বিশ্বাস পাড়াবাসীর।

তাই বিচার সালিশ ও তাবিজ কবজ নিয়ে পাড়াবাসীর সাথে বিরোধ চলে আসছিল।

বৃহস্পতিবার(২৪ ফেব্রুয়ারী) রাতে পাড়ার লোকজন ক্ষিপ্ত হয়ে পাড়া কারবারীর বাসায় গিয়ে কারবারী লকরুই ম্রোকে বলেন মন্ত্রের বান ও তাবিজ কবজ দিয়ে যাদের অসুস্থ করে রেখেছেন, সবাইকে সুস্থ করে সেরে তুলতে। পাড়াবাসীর একথায় ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে এবং জবাবে পাড়াপ্রধান কারবারী লকরুই ম্রো মন্ত্রের তাবিজ কবজের প্রমাণ চান পাড়াবাসীর কাছে। বলেন, তোমরা প্রমাণ দিতে না পারলে জঙ্গলে পার্টিকে লাগিয়ে সবাইকে পিটাবে।

এ কথায় বাকবিতন্ডার তর্কে জড়িয়ে পড়েন। পরে একপর্যায়ে মারপিট বেধে গেলে ঘটনাস্থলে কারবারীসহ একই পরিবারের তিন সন্তানসহ চারজনকে মেরে ফেলেন পাড়াবাসীরা।

পরে আরেকটি ঘরে গিয়ে কারবারী আরেক সেজ ছেলেকে কোপ দিয়ে হত্যা করা হয়। এতে কারবারী (পাড়া প্রধান) ও তাঁর বড় ছে‌লেসহ পাঁচজন মারা যায়।

এসময় হত্যা ঘটনায় অংশগ্রহণকারীরা পাড়াপ্রধানের আরেক ছেলে মেনলক ম্রো(৩৫) ধরে বেধে ফেলা হয়। তবে সে তাঁর বাবা ও ভাইদের মেরে ফেলার ঘটনায় কোথাও অভিযোগ জানিয়ে বিচার চায়বেনা এবং হত্যাকারীদের প্রতিশোধ নেবে না প্রতিশ্রুতি নিয়ে শপথ করানোর পর মেনলক ম্রো কে ছেঁড়ে দেয়। এঘটনায় সেও গুরুতর আহত হয়েছিল।

পাড়া প্রধানের স্ত্রী তুনকং ম্রো জানান ওই রাতের ঘটনার সময় থেকে চতুর্থ সন্তান মেনলকের কারোর সাথে যোগাযোগ নেই। তাকেও মেরে ফেলেছিল কিনা বলতে পারছেন না কেউ।

এদিকে দুপুরে শুক্রবার(২৫ ফেব্রুয়ারী) খবর পে‌য়ে রুমা থানার এসআই আতিক ও আমিনের নেতৃত্বে একটি পুলিশের দল ঘটনাস্থলে পৌঁছেন।

এ প্রতিবেদক সরেজমিনে গেলে এসআই আতিক বলেন রাতে মেরে ফেলার পর হয়তো গুম করার জন্য একটি ঝরনা খাদে ফেলে দেয়। পুলিশ লাশ পাঁচটি উদ্ধার করে রুমা থানাায় আনেন।

অন্যদিকেদিকে অভিযুক্ত রুইতুই ম্রো হত্যার ঘটনা স্ব-শরীরে অংশ নেয়ার কথা স্বীকার করেছেন।

তিনি এপ্রতিবেদককে বলেন পাড়াপ্রধান মন্ত্রের জাদুর বান দিয়ে পাড়াবাসীকে অনেক কষ্ট দিয়ে মেরেছে। এটা অনেক দিন ধরে চলছে।

এখন তাঁর(রুইতুই ম্রো) ছেলে রেংচং ম্রো(১৮) গত তিন বছর ধরে অসুস্থ। তাই তিনি নিজ হাতে মেরেছেন। এতে অনেকজন অংশ গ্রহণ করেছে বলে জানালেন রেংতুই ম্রো।

রুমা থানা ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা(ওসি) দায়িত্বে থাকা সহকারী পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আবুল কাসেম চৌধুরী বলেন হত্যা মামলা প্রক্রিয়া চলছে। আগামিকাল শনিবার ময়না তদন্তের জন্য জেলা সদরে মর্গে পাঠানো হবে।

আরও পড়ুন
আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না।