বান্দরবানের উ চ হ্লা ভান্তের শিষ্য কে এই ভূমিদস্যু বাচ মং মার্মা ?

যেকোন ধর্মীয় স্থাপনা বিরোধপূর্ন ভূমিতে নির্মান না করার বৌদ্ধ ধর্মসহ বিভিন্ন ধর্মে ধর্মীয় বিধান থাকলেও বান্দরবানে একের পর এক ভূমি দখল করে আলোচনার কেন্দ্র বিন্দুতে আসেন বাচ মং মার্মা। চট্টগ্রামের বাজালিয়া ইউনিয়নের মৃত আ প্রু মং মার্মার সন্তান বাচ মং ৮৫ সালের দিকে বান্দরবান শহরে বসবাস শুরু করেন। এরপর স্বর্ণ জাদী ও রাম জাদির প্রতিষ্ঠাতা উচহ্লা ভান্তের অন্যতম শিষ্য হিসাবে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগে চাকুরীরত বাচ মং মার্মা গুরু ভান্তের নির্দেশে জেলার রোয়াংছড়ি উপজেলার রামজাদী সংলগ্ন ভূমি ও সরকারের বন বিভাগের ভূমি দখল করে এবং প্রধান নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট এর হামলার অন্তরালে থেকে আলোচিত হন। অনেকে প্রশ্ন তুলেন, অসীম ক্ষমতাধর এই বাচ মং মার্মা’র আসলে খুঁটির জোর কোথায়? যে সবসময় ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়। আর এ নিয়ে পাহাড়বার্তা’র অনুসন্ধানী প্রতিবেদন।

ধর্মের নামে যা করে বাচ মংসহ ভান্তের কিছু শিষ্য
বান্দরবান জেলার রোয়াংছড়ি উপজেলার ৩৪০ নং তারাছা মৌজায় খ্রিস্টান প্রতিষ্ঠা, বৌদ্ধ অনুসারীসহ অর্ধ শতাধিক পরিবারের নিজস্ব ভূমি দখলে নেওয়ার জন্য খাগড়াছড়ির ভান্তের আরেক শিষ্য মং ঝং চৌধুরী ৩ কোটি টাকার মানহানির মামলা করে কমিশনার দিলীপ বড়ুয়া, অজিত দাশসহ ৮ জনের বিরুদ্ধে। অন্যদিকে একই ব্যক্তি উচহ্লা ভান্তে ও বাচমং এর নির্দেশে জেলা শহরের মধ্যম পাড়ার বাসিন্দা কিরন বড়ুয়া, প্রয়াত সুশিল বড়ুয়ার বিরুদ্ধে রোয়াংছড়ি বাসস্টেশনের গলাচিপা এলাকায় তার এক মহিলা শিষ্যকে ধর্ষনের চেষ্টার অভিযোগে আরেকটি মামলা করে। অন্যদিকে জেলা শহরের বনরুপা পাড়ায় বাবুল দে এর কন্যা হিন্দু তরুণী রোজী দে ও তার মা স্বরস্বতী দে উচহ্লা ভান্তের অন্যতম শিষ্য ছিলেন। কয়েকবছর আগে এই তরুণী আত্মহত্যা করলে ভান্তের ও শিষ্য বাচমং এর তদবির ও প্রভাবে এই তরুণীকে ময়নাতদন্ত ছাড়া সৎকার করা হয়। এই তরুণীর মৃত্যুর জন্য অনেক ভান্তেকে দায়ী করেন। এই ঘটনার পর থেকে তরুণীর মা স্বরস্বতী ভান্তের বিহারে আর পা মাড়ায়নি, সন্তান হারিয়ে এখন অনেকটা বন্দি জীবন কাটান।

এই ব্যাপারে বান্দরবানের পৌর কমিশনার দীলিপ বড়ুয়া বলেন, উচহ্লা ভান্তে, বাচমং মার্মা’রা আমাদেরসহ বিভিন্ন মানুষের ভূমি দখল করে, আইন-আদালত অমান্য করে আমাদের বিরুদ্ধে একের পর এক মামলা দায়ের করে হয়রানি করে, আমরা আইনের আশ্রয় নিলেও তারা প্রভাব বিস্তার করতো।

ভান্তের শিষ্যদের যে ঘটনা আলোচিত
২০০৬ সালে উ চ হ্লা ভান্তে ও খিয়ংওয়া কিয়ং রাজগুরু বিহারের সদ্য বিদায়ী সাধারণ সম্পাদক বাচ মং মার্মা, সুমনা ভান্তে ওরফে কালাইয়া ভান্তেসহ তার সশস্ত্র ক্যাডারদের নিয়ে রোয়াংছড়ি উপজেলার তারাছা ইউনিয়নের অধিগ্রহন ভুক্ত ও বেসরকারী মালিকানাধীন ও নিরীহ বড়ুয়া সম্প্রদায়সহ বিভিন্ন জনের ভূমি দখল করে। দখলের বিভিন্ন অভিযোগের প্রেক্ষিতে ২০০৭ সালে যৌথ বাহিনী কর্তৃক অবৈধ উচ্ছেদ করতে গেলে উচ্ছেদ টিমের প্রধান নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট জিল্লুর রহমানের উপর লাঠিসোটা ও ধারালো কিরিচ নিয়ে হামলা করে। এসময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যসহ আহত হয় অর্ধশত মানুষ। এসময় সুমনা ভান্তে (সুমন বড়ুয়া) কালাইয়া ভান্তেকে গ্রেফতার করা হলে বান্দরবান কারাগারে থাকা এই ভান্তে সেখানে অন্যকারা বন্দিদের উপর নির্যাতন শুরু করলে সেসময় তাকে রং কাপড় খুলে কারা কর্তৃপক্ষ শারীরিক শাস্তি প্রদান করে এবং কিছুদিনের মধ্যে সে বেকসুর খালাস পেয়ে জেল থেকে বের হয়।

বাচ মংদের বিরুদ্ধে যত মামলা
খ্রিস্টান মিশনসহ বিভিন্ন মানুষের ভূমি দখলের অভিযোগে ভূমি ফিরে পেতে উচহ্লা ভান্তে ও তার শিষ্যদের বিরুদ্ধে একের পর এক মামলা দায়ের করে ভুক্তভোগীরা। যা সম্প্রিতীর বান্দরবানে কোন ধর্মীয় গুরু ও তার শিষ্যদের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের ঘটনা নজিরবিহীন। ১৯৯৯ সালের ১৬ জানুয়ারি ও ১৭ এপ্রিল সদর থানায়, ২০০০ সালের ১৭ ডিসেম্বর সদর থানায়, ২০০১ সালের ১৪ মে একটি অভিযোগ, ৫ সে সহকারী পুলিশ সুপার কার্যালয়ে, ২০০৫ সালে ২৫ জুলাই জেলার রোয়াংছড়ি থানা ও ১৭ জুলাই সদর থানায়, ২০ আগস্ট সদর থানায়, ২৩ অক্টোবর রোয়াংছড়ি থানায়, ২৬ নভেম্বর সদর থানায়, ২০০৬ সালের ৭ জানুয়ারি ও ২১ জানুয়ারি সহকারী পুলিশ সুপার কার্যালয়ে ও রোয়াংছড়ি থানায় মামলা ও অভিযোগ দায়ের করা হয়। এর বাইরেও বান্দরবান বন বিভাগের ভূমি দখল করে নেওয়ার অভিযোগে মামলা মোট ২৬টি মামলাসহ বিভিন্ন আদালত ও থানায় ভুক্তভোগীরা আরো অনেক মামলা দায়ের করে।

কারা করেছে বাচ মংয়ের বিরুদ্ধে মামলা

মিসসিআর ৬৬/১১,পিটিশন ১২৭/১১ বোমাং সার্কেলের প্রয়াত রাজা মংশৈ প্রু চৌধুরীর সহধর্মিনী রাণী মাতা মাশৈনু বাচমং মার্মা ও উচহ্লা ভান্তেকে বিবাদী করে মামলা করে। মিসসিআর ৭৭/১১,পিটিশিন ১০১/১১ বান্দরবান পৌরসভার সাবেক মেয়র জাবেদ রেজা বাদী হয়ে বাচ মং মার্মাকে আসামী করে মামলা দায়ের করে। মিসসিআর-৭৯/১৪,পিটিশন-৭৮/২০১৪ রমেশ ত্রিপুরা বাদী হয়ে বাচমং মার্মা ও উচহ্লা ভান্তেসহ ৫জনকে আসামী করে মামলা করেন। মিসসিআর-৮৩/১৪,পিটিশন-১২৩/১৪ নজরুল ইসলাম বাদী হয়ে বাচমং মার্মাসহ ৪জনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। মিসসিআর ২৫/১৫,পিটিশন-১৩/১৫ এসমং মার্মা বাদী হয়ে বাচমং মার্মার বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। মিসসিআর ৩০/১৫,পিটিশন ৩১/১৪ বাচমং মার্মার বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। মিসসিআর-৬০/১১,পিটিশন-১০০/১১ রাজপুত্র নুমং প্রু চৌধুরী বাদী হয়ে বাচমং মার্মাকে প্রধান আসামী করে উচহ্লা ভান্তেসহ আরো ৫জনের নামে মামলা দায়ের করেন। রহিম ত্রিপুরা মিসসিআর-৬৩/১১,পিটিশন ৯৯/১১ বাদী হয়ে বাচমং মার্মাকে প্রধান আসামী করে আরো ৫জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে। মিসসিআর ৩৬/০৮ পিটিশন-১০/০৮ রাততো মালা বাদী হয়ে বাচমং মার্মাকে প্রধান আসামী করে একটি মামলা দায়ের করে। অপরদিকে কমিশনার দীলিপ বড়ুয়ার বিরুদ্ধে ৩টি, কমিশনার অজিত দাশ এর বিরুদ্ধে ১টিসহ অসংখ্য মানুষের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে উচহ্লা ভান্তে।

এই ব্যাপারে বান্দরবান পৌরসভার কমিশনার অজিত দাশ বলেন, যেকোন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হয় নিস্কন্ঠক ভূমিতে, সেখানে আমাদের ভূমি দখল করে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয়েছে, এটা ধর্মবিরোধী কাজ।

কাদের ভূমি দখল করলেন বাচমং মার্মা ?
বান্দরবান শহরের ফাতেমা রাণী ক্যাথলিক মিশন গির্জার নামীয় ৫৮/৫৯,১৩৫ হোল্ডিং বা খতিয়ান এর ৫.৫৭ একর । মো: নুরুল আলমের ৯২ হোল্ডিং বা খতিয়ানের ৫ একর, আবুল মাবুদের একই হোল্ডিং বা খতিয়ানের ২ একর। ৩০৯ নং হোল্ডিং বা খতিয়ান এর আবুল কাশেম,মো: জোবায়ের, আমেনা বেগম, মো: আবুল, ও মো: আব্দুল রহিমের ১.৭২ একর। নবাব মিঞার ১৯৩ (অংশ) ১৫৩ হোল্ডিং বা খতিয়ানের ১ একর। সুলতান আহাম্মদ এর ৫৮ হোল্ডিং বা খতিয়ানের ৫ একর। কাজী মুজিবর রহমান এর ১৯৩-১৫৩ হোল্ডিং বা খতিয়ানের ১.৩৬ একর। মুজিবর রহমানের ২০২ নং হোল্ডিং বা খতিযানের ৪.৫০ একর। হ্লাপাই মং মার্মা ,অতুল আসাম, জয়চন্দ্র ত্রিপুরা, হাকিলা ত্রিপুরা, জন বাহাদুর ত্রিপুরার ১০ নং হোল্ডিং বা খতিয়ানের ৫ একর, ইমারু ত্রিপুরা ২০৪ নং হোল্ডিং বা খতিয়ানের ৪ একর, মহিদুর রহমান চৌধুরীর ২০২ নং হোল্ডিং বা খতিয়ানের ৫ একর, নির্বাহী প্রকৌশলী সড়ক ও জনপদ বিভাগ বান্দরবান এর ৭১ হোল্ডিং বা খতিয়ানের ২ একর এবং ২২০ নং হোল্ডিং বা খতিয়ানের ১একর এবং ১৯৩/১৫৩ হোল্ডিং বা খতিয়ানের ০.৫০ একর। একই হোল্ডিং বা খতিয়ানের মোহাম্মদ আমিনুল হক এর ৩ একর। সোয়াংহ্লা প্রু এর ২২০ নং হোল্ডিং বা খতিয়ানের ৪একর। র.ক.ম. নুরুল আমিন এর ৭৬ হোল্ডিং বা খতিয়ানের ৪.৫০ একর। বোমাং সার্কেলের প্রয়াত রাজা মংশৈ প্রু চৌধুরীর পুত্র নুমং প্রু চৌধুরীর ১১৫ হোল্ডিং বা খতিয়ানের ৮ একর, তৈদুহা ত্রিপুরার ৬৯ হোল্ডিং বা খতিয়ানের ৫ একর। খোদ সরকারের বন্দোবস্তি দেওয়া মিরাজ শাহ নেওয়াজ আহম্মেদ এর ১ একর ২য় ও ৪ একর ৩য় শ্রেণীর জায়গা দখল করে। আর এই ভূমি নিজেদের দখলে নেওয়ার জন্য সেখানে কবরস্থান গড়ে তোলার জন্য এক ভান্তে ও এক মুসলিম নারীকে দাফন করা হয়।

এই বিষয়ে চট্টগ্রাম ক্যাথলিক ধর্ম প্রদেশ এর (ভূমি কমিশন) সেক্রেটারি ফাদার জেরম ডি রোজারিও পাহাড়বার্তা’কে বলেন, বিষয়টি আদালতে মামলা চলমান আছে, আমরা আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। আইন অনুসারেই আমরা আমাদের ভূমি অবশ্যয় পাবো বলে মনে করছি।

অভিযোগের বিষয়ে যা বললেন বাচ মং মার্মা
খিয়ংওয়া কিয়ং রাজগুরু বিহারের সদ্য বিদায়ী সাধারণ সম্পাদক বাচ মং মার্মা ফোনে পাহাড়বার্তাকে বলেন, বন বিভাগ আমাকে মিথ্যা মামলায় জড়িয়েছে, আমি তাদের জায়গা দখল করিনি, জায়গাটি আমার। বর্তমানে জায়গাটি আমার দখলে আছে।

রামজাদি সংলগ্ন ভূমি দখলের বিষয়ে তিনি পাহাড়বার্তাকে আরো বলেন, আপনাকে (প্রতিবেদক) যে আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ দিয়েছে, সেগুলো আমাকে দেখান, আমি আপনার প্রশ্নের উত্তর দিতে বাধ্য নয়। কথা বলার এক পর্যায়ে তিনি ক্ষুদ্ধ হয়ে কথা শেষ না হতেই ফোন কেটে দেন।

স্থানীয়রা মনে করেন, দ্রুত বিষয়গুলো তদন্ত করে বাচ মং মার্মাসহ তার সহযোগীদের আইনের আওতায় আনলে হয়রানি ও নির্যাতনের শিকার থেকে রক্ষা পাবে সাধারণ মানুষ, রক্ষা পাবে সরকারী ভূমি। অন্যদিকে যা সম্প্রিতীর বান্দরবানের জন্য বিষয়টির গুরত্ব অপরিহার্য বলে মনে করছে অনেকে।

আরও পড়ুন

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না।