মাটিরাঙ্গায় জনপ্রিয়তা পাচ্ছে মালচিং পদ্ধতি

পাহাড়ের ঢালে আধুনিক কৃষির নতুন দিগন্ত শীতের সকালের কুয়াশা ভেদ করে যখন সূর্যের আলো পাহাড়ের ঢালে নেমে আসে, তখন চোখে পড়ে সারি সারি সবুজ গাছ। তার নিচে কালো পলিথিনে ঢাকা জমি। এটি আর দশটা চাষের দৃশ্য নয় এটি আধুনিক কৃষির এক সফল প্রয়োগ, মালচিং পদ্ধতি।

খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গা উপজেলায় পাহাড়ি কৃষির নতুন সম্ভাবনা হিসেবে এই পদ্ধতি এখন কৃষকদের মুখে মুখে। পাহাড়ি অঞ্চলে পানির স্বল্পতা, আগাছার আধিক্য ও শ্রম সংকট দীর্ঘদিনের চিরাচরিত সমস্যা। এসব সমস্যার কার্যকর সমাধান হিসেবে মালচিং পদ্ধতি এখন হয়ে উঠছে কৃষকের ভরসা। পলিথিন বা জৈব আবরণে জমি ঢেকে চাষ করার ফলে মাটির আর্দ্রতা দীর্ঘদিন ধরে রাখা যাচ্ছে, কমছে সেচের প্রয়োজন এবং বাড়ছে ফলন।

মাটিরাঙ্গা পৌর এলাকার চড়পাড়ায় আব্দুর রবের সবজি খেতে পা রাখতেই চোখে পড়ে ভিন্ন এক চিত্র। সারি সারি জমিনজুড়ে কালো মালচিং পলিথিনে ঢাকা ক্ষেত দূর থেকে দেখলে যেন পুরো জমিটাই পরিপাটি করে বিছানা পাতা। পরিচ্ছন্ন, সুশৃঙ্খল ও দৃষ্টিনন্দন এই চাষপদ্ধতি এক নজরেই জানান দেয় আধুনিক কৃষির উপস্থিতি।

দেখতে যেমন সুন্দর, কার্যকারিতায়ও তেমনি সফল মালচিং পদ্ধতি। কম খরচে চাষ, আগাছামুক্ত জমি, সেচের পানির সাশ্রয় এবং পরিবেশবান্ধব বৈশিষ্ট্যের কারণে এটি হয়ে উঠেছে পাহাড়ি কৃষির নতুন সম্ভাবনা। উন্নত প্রযুক্তির ছোঁয়া যেন শোভা পাচ্ছে আব্দুর রবের পুরো সবজি খেতজুড়ে।

আব্দুর রব জানান, তিনি গত কয়েক বছর ধরে নিজের জমিতে নিয়মিত মালচিং পদ্ধতি ব্যবহার করে আসছেন। শুরুতে নতুন প্রযুক্তি নিয়ে কিছুটা সংশয় থাকলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এর সুফল স্পষ্ট হয়েছে। ফলন বেড়েছে, শ্রম ও পরিচর্যার ঝামেলা কমেছে এবং বাজারে সবজির ভালো দাম পাওয়ায় তিনি পুরোপুরি সন্তুষ্ট।

তার অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে, আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি সঠিকভাবে প্রয়োগ করা গেলে পাহাড়ি অঞ্চলেও টেকসই ও লাভজনক চাষ সম্ভব। আব্দুর রবের সবজি খেত এখন শুধু উৎপাদনের জায়গা নয়, বরং আশপাশের কৃষকদের জন্য হয়ে উঠেছে এক জীবন্ত উদাহরণ।

আব্দুর রবের সফলতার ধারাবাহিকতায় এখন আর চড়পাড়ার একটি জমিতেই সীমাবদ্ধ নেই মালচিং পদ্ধতির ব্যবহার। মাটিরাঙ্গার বেলছড়ি, গোমতী, তবলছড়ি, তাইন্দংসহ পৌর এলাকার বিভিন্ন পাহাড়ি ঢালে ছড়িয়ে পড়েছে এই আধুনিক চাষ পদ্ধতি। চোখ মেললেই দেখা যায় সারি সারি মালচিং পলিথিনে ঢাকা জমিতে টমেটো, শসা, বেগুন, মরিচ ও তরমুজের চাষ। পাহাড়ের ঢালে ঢালে সবুজের এমন পরিপাটি বিস্তার একদিকে যেমন দৃষ্টিনন্দন, অন্যদিকে তেমনি জানান দিচ্ছে পাহাড়ি কৃষিতে আসা ইতিবাচক পরিবর্তনের বার্তা।

এদিকে, শসা গাছসহ বিভিন্ন ফসলের গাছে সম্প্রতি দেখা গেছে নতুন এক পদ্ধতি। সাদা রঙের সূতা দিয়ে মাচা সদৃশ কাঠামো তৈরি করে ব্যবহার করছেন কৃষকেরা। কৃষকদের ভাষ্য অনুযায়ী, এই সূতা বেয়ে গাছ সহজেই উপরের দিকে উঠে বেড়ে ওঠে। এতে গাছের বৃদ্ধি ভালো হয় এবং ফলনও বাড়ে।

NewsDetails_03

মাটিরাঙ্গা কৃষি অফিসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪–২৫ অর্থবছরে উপজেলায় সবজি চাষের জমির আবাদ ছিল ৫৯০ হেক্টর এবং উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয় ১১,০৬৩.৫ মেট্রিক টন। পরবর্তী ২০২৫–২৬ অর্থবছরে সবজি চাষের জমির পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় ৬১০ হেক্টরে, যেখানে সম্ভাব্য উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১১,৪৩৮.৫ মেট্রিক টন। এ সময় প্রায় সবকটি জমিতে মালচিং পদ্ধতি ব্যবহার করে চাষাবাদ করা হয়েছে।

উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্যমতে, চলতি মৌসুমে মালচিং পদ্ধতিতে চাষের আওতা গত বছরের তুলনায় প্রায় ৩০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।

মালচিং পদ্ধতির বড় সুবিধা হলো উৎপাদন ব্যয় হ্রাস। কৃষি বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, এই পদ্ধতিতে চাষ করলে উৎপাদন খরচ ২০–২৫ শতাংশ পর্যন্ত কমে এবং ফলন বৃদ্ধি পায় ১৫–২০ শতাংশ। পাশাপাশি রোগবালাই ও পোকামাকড়ের আক্রমণও তুলনামূলকভাবে কম হয়।

চড়পাড়ার কৃষক রমিজ মিয়া বলেন, “আগে আগাছা পরিষ্কার করতেই অর্ধেক সময় চলে যেত। এখন মালচিং দেওয়ার পর আগাছা হয় না, পানি কম লাগে। ফলনও চোখে পড়ার মতো বেড়েছে।”

কৃষক আব্দুর হাই বলেন, “আগে চাষ করতে গিয়ে আগাছা দমন আর পানির চিন্তায় বেশ ভোগান্তি পোহাতে হতো। মালচিং পদ্ধতি ব্যবহারের পর সেই কষ্ট অনেকটাই কমেছে। এই পদ্ধতিতে চাষ করলে সবজির রং উজ্জ্বল থাকে, আকার হয় তুলনামূলক বড় এবং দেখতে আকর্ষণীয় হয়। বাজারে নিলে ক্রেতাদের আলাদা করে ডাকতে হয় না—নিজেরাই আগ্রহ দেখায়। এখন ভালো দাম পাচ্ছি, সংসার চালানো সহজ হচ্ছে।”

কৃষক আবুল কালাম বলেন, “পাহাড়ি এলাকায় চাষের সবচেয়ে বড় সমস্যা পানি আর আগাছা। আগে দুই–তিন দিন পরপর আগাছা পরিষ্কার করতে হতো। মালচিং পদ্ধতির কারণে সেই সমস্যা নেই। জমির আর্দ্রতা দীর্ঘদিন থাকে, সেচের প্রয়োজন অর্ধেকেরও বেশি কমেছে। ফলন ও সবজির মান দুটোই বেড়েছে।”

মাটিরাঙ্গা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. সবুজ আলী বলেন, পাহাড়ি কৃষির জন্য মালচিং একটি পরিবেশবান্ধব ও টেকসই প্রযুক্তি। কৃষকদের আগ্রহ বাড়াতে নিয়মিত প্রশিক্ষণ, মাঠ দিবস ও প্রদর্শনী প্লট স্থাপন করা হচ্ছে। বিশেষ করে পানি সাশ্রয়ী কৃষি ব্যবস্থাপনায় এটি কার্যকর ভূমিকা রাখছে।

তিনি আরও বলেন,“মালচিং পদ্ধতি ব্যাপকভাবে সম্প্রসারণ করা গেলে পাহাড়ি অঞ্চলে সবজি উৎপাদনে এক ধরনের বিপ্লব ঘটবে এবং কৃষকের আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।”

কৃষি সংশ্লিষ্টদের মতে, আধুনিক প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার পাহাড়ি কৃষিকে টেকসই করতে পারে। মালচিং পদ্ধতি সেই সম্ভাবনারই বাস্তব উদাহরণ। মাটিরাঙ্গার পাহাড়ে এখন শুধু ফসল নয়, জন্ম নিচ্ছে নতুন আশার বীজ।

আরও পড়ুন