কাপ্তাই হ্রদের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে প্রয়োজন মহাপরিকল্পনা

পাহাড়ের বুকজুড়ে নীল জলরাশি। পানির সঙ্গে মিশে গেছে সবুজ পাহাড়ের ঢাল। কোথাও পাহাড়ের গায়ে মেঘের ছায়া, কোথাও নৌকার ছুটে চলায় ঢেউয়ের দোলাচল। প্রকৃতির এমন অপরূপ মেলবন্ধনেই প্রতিদিন মুগ্ধ হন অসংখ্য পর্যটক। এটি রাঙামাটির কাপ্তাই হ্রদ—যে হ্রদের জন্ম হয়েছিল পর্যটনের জন্য নয়, বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রয়োজনে। সময়ের পরিক্রমায় সেই জলাধারই এখন পরিণত হয়েছে দেশের অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটন সম্পদে।

কাপ্তাই হ্রদের ইতিহাস মূলত কর্ণফুলী নদীর ওপর বাঁধ নির্মাণের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িত। জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যে ১৯৫৬ সালে কাপ্তাই বাঁধ নির্মাণের কাজ শুরু হয়। ১৯৬০ সালে বাঁধ নির্মাণ শেষ হলে পাহাড়ি উপত্যকার বিস্তীর্ণ এলাকা পানিতে তলিয়ে গিয়ে সৃষ্টি হয় বিশাল কৃত্রিম জলাধার। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, এর ফলে বিপুল কৃষিজমি ও বনভূমি নিমজ্জিত হয় এবং প্রায় এক লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়।

কিন্তু ইতিহাসের সেই জলাধারই ধীরে ধীরে রাঙামাটির ভূপ্রকৃতির সঙ্গে মিশে এক অনন্য নৈসর্গিক রূপ ধারণ করে। পাহাড়, জল, বন আর দ্বীপের সমন্বয়ে কাপ্তাই হ্রদ হয়ে ওঠে পর্যটকদের কাছে আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু। রাঙামাটির পর্যটন বলতে এখন কাপ্তাই হ্রদকে বাদ দেওয়ার সুযোগ নেই।

জলের টানে ছুটে আসেন পর্যটক :
কাপ্তাই হ্রদের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ নৌভ্রমণ। রিজার্ভ বাজার, তবলছড়ি ও পর্যটন ঘাট থেকে নৌযানে চড়ে হ্রদের বিস্তীর্ণ জলরাশি ঘুরে দেখেন পর্যটকরা। হ্রদের বুকে নৌযাত্রার পাশাপাশি পাহাড়ের দৃশ্য, ঝরনা, দ্বীপ ও পাহাড়ি জনপদের জীবনযাত্রা পর্যটকদের বাড়তি আকর্ষণ তৈরি করে।

বিশেষ করে ছুটির দিন, ঈদ, পূজা ও বিভিন্ন উৎসবকে কেন্দ্র করে রাঙামাটিতে পর্যটকের চাপ বাড়ে। পর্যটকদের উপস্থিতিকে ঘিরে সক্রিয় হয়ে ওঠে হোটেল-মোটেল, রেস্তোরাঁ, নৌযান, পরিবহন, ক্ষুদ্র ব্যবসা ও স্থানীয় পর্যটননির্ভর কর্মসংস্থান। ফলে কাপ্তাই হ্রদ এখন শুধু একটি দর্শনীয় স্থান নয়; এটি রাঙামাটির পর্যটন অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।

সম্ভাবনা বিশাল, ব্যবস্থাপনায় ঘাটতি :
কাপ্তাই হ্রদকে ঘিরে সম্ভাবনা থাকলেও পর্যটন ব্যবস্থাপনায় এখনো রয়েছে নানা সীমাবদ্ধতা। নৌযানের নিরাপত্তা, পর্যটন ঘাটের আধুনিকায়ন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ সংরক্ষণ, পর্যটন স্পটগুলোর অবকাঠামো এবং পর্যটকদের জন্য সমন্বিত তথ্যসেবার উন্নয়ন প্রয়োজন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু পর্যটকের সংখ্যা বাড়ালেই হবে না; কাপ্তাই হ্রদকে করতে হবে পরিবেশবান্ধব ও টেকসই পর্যটনকেন্দ্র। হ্রদের পানিদূষণ রোধ, প্লাস্টিক বর্জ্য নিয়ন্ত্রণ, নৌযানে নিরাপত্তা সরঞ্জাম নিশ্চিতকরণ এবং দর্শনীয় স্থানগুলোর ধারণক্ষমতা বিবেচনায় নিয়ে পর্যটন পরিকল্পনা করা জরুরি।

‘লেক ট্যুরিজম’ হতে পারে নতুন অর্থনৈতিক শক্তি :
কাপ্তাই হ্রদকে কেন্দ্র করে একটি সমন্বিত ‘লেক ট্যুরিজম’ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা গেলে রাঙামাটির পর্যটন অর্থনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ হতে পারে। আধুনিক পর্যটন ঘাট, নির্ধারিত নৌরুট, অনলাইন টিকিট ও বুকিং ব্যবস্থা, প্রশিক্ষিত নৌযান চালক, পর্যটক গাইড এবং জরুরি উদ্ধারব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে।

এর পাশাপাশি স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে পর্যটন অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত করা প্রয়োজন। পাহাড়ি খাবার, স্থানীয় কৃষিপণ্য, হস্তশিল্প, তাঁত ও সাংস্কৃতিক পরিবেশনা পর্যটনের সঙ্গে যুক্ত করা গেলে পর্যটকদের ব্যয় যেমন বাড়বে, তেমনি স্থানীয় মানুষের আয়ও বাড়তে পারে।

বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রয়োজনে যে হ্রদের জন্ম, সময়ের ব্যবধানে সেটিই আজ রাঙামাটির পর্যটনের প্রাণ। ইতিহাসের সঙ্গে প্রকৃতি, অর্থনীতির সঙ্গে জীবিকা আর নীল জলরাশির সঙ্গে মানুষের মুগ্ধতার এই সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করতে এখন প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা।

কাপ্তাই হ্রদ তাই শুধু জলবিদ্যুতের স্মারক নয়, এটি এখন পাহাড়ের অন্যতম মহাসম্পদ। এমন‌কি বাংলা‌দে‌শেরও। পরিকল্পিত সংরক্ষণ, নিরাপদ ব্যবস্থাপনা ও টেকসই পর্যটন উন্নয়ন নিশ্চিত করা গেলে এই নীল জলরাশিই হয়ে উঠতে পারে শুধু রাঙামাটি নয়, বাংলা‌দে‌শের অর্থনৈতিক অগ্রগতির অন্যতম বড় চালিকাশক্তি।

আরও পড়ুন