নাইক্ষ্যংছড়িতে প্রবাসীর স্ত্রীর ২০ একর জমি দখলবাজীতে কেয়ারটেকার !
জাল কাগজের কারসাজি
বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার বাইশারী ইউনিয়নে কেয়ারটেকার ও নাইটগার্ডের বিরুদ্ধে মালিকের বিশাল সম্পত্তি দখলের চেষ্টার অভিযোগ উঠেছে।
প্রবাসীর স্ত্রী সাজেদা বেগমের দাবি, নিয়োগপ্রাপ্ত কেয়ারটেকার হাফেজ আহমদ জাল কাগজপত্র তৈরি করে তার প্রায় ২০ একর জমি ও রাবার বাগান দখলের পাঁয়তারা করছে। বিষয়টি ইতোমধ্যে আদালত পর্যন্ত গড়ালেও আইনি জটিলতায় দিশেহারা হয়ে পড়েছেন ভুক্তভোগী এই নারী।
ভুক্তভোগী ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বাইশারী মৌজার ২৭৮ নম্বরের আওতাধীন ৩৭৮/৩৭১ নম্বর হোল্ডিংয়ে প্রায় ২০ একর জমি ২০১২ সালে আবুল হাশেম ও তার ভাইদের কাছ থেকে ক্রয় করেন সাজেদা বেগম। এর মধ্যে প্রায় ৩ একর ১০ শতক খতিয়ানি এবং বাকি অংশ রিপোর্ট ও খাস জমি। জমিতে পরবর্তীতে রাবার বাগান গড়ে তোলা হয়।
জমির একটি অংশ—প্রায় ১ একর ৬০ শতক—যার মধ্যে প্রথম শ্রেণীর জমি ও খাস জমি রয়েছে, সেটির দেখভালের জন্য রামু উপজেলার গর্জনিয়া ইউনিয়নের বাসিন্দা হাফেজ আহমদকে কেয়ারটেকার ও নাইটগার্ড হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।
কেয়ারটেকারের জালিয়াতির ফাঁদ
সাজেদা বেগম অভিযোগ করেন, দীর্ঘদিন দায়িত্বে থাকার সুযোগে কেয়ারটেকার হাফেজ আহমদ কৌশলে জমির ওপর নিজের দাবি প্রতিষ্ঠার চেষ্টা শুরু করেন। তিনি বলেন, “প্রায় ১০ বছর বাগান দেখাশোনা করার পর হঠাৎ করে শ্রমিকদের সঙ্গে খারাপ আচরণ শুরু করে। পরে তাকে চাকরি থেকে বাদ দিলে সে প্রতিশোধ নিতে জাল স্ট্যাম্প ও নোটারি করে আমার জমি দখলের চেষ্টা শুরু করে।”
তার অভিযোগ, হাফেজ আহমদ একটি সন্ত্রাসী গোষ্ঠী ভাড়া করে জমিতে টহল দিচ্ছে এবং পাহারাঘর দখল কিংবা আগুন দেওয়ার হুমকি দিচ্ছে। ফলে স্বামী প্রবাসে থাকায় একা নারী হিসেবে তিনি নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।
বিক্রেতার বক্তব্য জমির বিক্রেতা আবুল হাশেম বলেন, “আমরা প্রায় ১২ বছর আগে আমাদের পৈত্রিক জমি সাজেদা বেগমের কাছে বিক্রি করেছি। ২০১৩ সালে সব কাগজপত্র বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু কেয়ারটেকার হাফেজ আহমদ সম্পূর্ণ ভুয়া কাগজ বানিয়ে মালিকানা দাবি করছে।”
তিনি আরও বলেন, “আমার নামে যে দলিল দেখানো হচ্ছে সেটাও জাল। এ বিষয়ে আমরাও আইনি পদক্ষেপ নিয়েছি।”

তদন্তে জালিয়াতির প্রমাণ
নাইক্ষ্যংছড়ি সহকারী কমিশনার (ভূমি) ইসমাত জাহান ইতু ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে বলেন,
“অভিযুক্তদের কোনো বৈধ কাগজপত্র পাওয়া যায়নি। তারা বহিরাগত এবং তাদের আচরণও ছিল অস্বাভাবিক। প্রাথমিকভাবে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে।”
বাইশারী তদন্ত কেন্দ্রের ইনচার্জ (আইসি) মো. আনোয়ারুল ইসলাম তার প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন, “বিরোধীয় জমির প্রকৃত মালিক সাজেদা বেগম। কেয়ারটেকার হাফেজ আহমদ ভুয়া চেয়ারম্যান সার্টিফিকেট ও স্ট্যাম্প তৈরি করে জমি দখলের চেষ্টা করছে।”
আইনজীবী যা বললেন
বান্দরবান জেলা ও দায়রা জজ আদালতের আইনজীবী অ্যাডভোকেট আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, “অভিযুক্ত ব্যক্তি যে দলিল দেখাচ্ছেন তা সম্পূর্ণ ভুয়া। তদন্ত রিপোর্ট আমাদের হাতে এসেছে। আদালতে বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে এবং আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
বাইশারী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আলম কোম্পানি বলেন, “সাজেদা বেগম ও আবুল হাশেম এলাকার পরিচিত মানুষ। কেয়ারটেকার হাফেজ আহমদ তার স্বাক্ষর জাল করে সার্টিফিকেট তৈরি করেছে, যা ইতোমধ্যে বাতিল করা হয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, “মূল জমির মালিক ছিলেন আবুল হাশেম ও তার ভাইরা। তারা বৈধভাবেই জমি বিক্রি করেছেন।”
অভিযুক্ত কেয়ারটেকার হাফেজ আহমদ অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, “আমি আবুল হাশেমের কাছ থেকে জমি কিনেছি।”
আতঙ্কে দিন কাটছে ভুক্তভোগীর
বর্তমানে জমি নিয়ে বিরোধ চরম আকার ধারণ করেছে। ভুক্তভোগী সাজেদা বেগম অভিযোগ করেন, তাকে নিয়মিত ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে এবং আদালতে দৌড়াদৌড়ির কারণে তিনি চরম দুর্ভোগে পড়েছেন।
স্থানীয়দের মতে, প্রশাসনের দ্রুত হস্তক্ষেপ না হলে যেকোনো সময় বড় ধরনের সংঘর্ষ বা অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটতে পারে।



