বন্যায় সর্বস্বান্ত বান্দরবানের কৃষকরা

টানা কয়েকদিনের ভারি বর্ষণের পাহাড়ী ঢল ও বন্যায় প্লাবিত বান্দরবানের ৭টি উপজেলায় কৃষিখাতের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, এর ফলে যেন দু:শ্চিন্তার শেষ নেই কৃষকদের।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, জেলার ফসলি জমি সহ সবজি ক্ষেত পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় দিশেহারা হয়ে পড়েছেন স্থানীয় কৃষকরা। অনেকের ক্ষেতের ফসল সহ সবজি সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে, আবার কারও কারো জমিতে দীর্ঘ সময় পানি জমে থাকায় একেবারে সব সবজি ক্ষেত নষ্ট হয়ে গেছে।

সরেজমিনের জেলা সদরের রেইছাসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, বৃষ্টির পানি ও পাহাড়ি ঢলে নিচু এলাকার কৃষিজমি ডুবে গেছে। এতে ধানি জমি, বেগুন, করলা, চিচিঙ্গা, ফল, ঢেরস, মরিচ, পেঁপে বাগান সহ বিভিন্ন মৌসুমি ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে, অনেক জায়গায় পাহাড়ের আম ,কাজু বাদামসহ বিভিন্ন পাহাড়ি বাগানের ভূমির বিভিন্ন অংশ ধসে পড়েছে, পচন ধরেছে বাগানের আনারসে। জমি প্রস্তুত, বীজ, সার, কীটনাশক ও শ্রমিকের পেছনে লক্ষ লক্ষ অর্থ ব্যয় করে ফসল উৎপাদন করলেও প্রাকৃতিক দুর্যোগে সব হারিয়ে সর্বস্বান্ত পড়েছে কৃষকরা।

আলীকদমের ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক ওসমান গনি জানান, টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের কারণে ফসলি জমি পানিতে তলিয়ে গেছে। অনেকের ফসল সম্পূর্ণ নষ্ট হয়েছে। ধারদেনা ও ঋণ করে চাষাবাদ করায় এখন কীভাবে সেই টাকা পরিশোধ করবেন, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন।

এদিকে জেলার মাঠ পর্যায়ের কৃষি কর্মকর্তারা দ্রুত সরেজমিনে ক্ষয়ক্ষতির সঠিক পরিমাণ নিরূপণ করে ক্ষতিগ্রস্ত প্রকৃত কৃষকদের তালিকা তৈরি করছে। কৃষির ক্ষতির বাস্তব চিত্র পাওয়া গেলে সরকার বা কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে ক্ষতিপূরণ হিসাবে সহজ শর্তে ব্যাংক ঋণ. বীজ, সারসহ বিশেষ কৃষি প্রণোদনা দেওয়া হবে।

জেলা সদরের রেইছা এলাকার কৃষক থোয়াই নু মং বলেন, বন্যায় আমাদের বেগুন, করলাসহ বিভিন্ন সবজি ক্ষেত নষ্ট হয়ে গেছে, আমাদের সহায়তা করা না হলে চাষাবাদ করা আর সম্ভব হবেনা।

NewsDetails_03

এই বিষয়ে গত বুধবার বান্দরবান সফররত বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত এমপি বলেন, ক্ষতি পুষিয়ে নিতে সরকারী ভাবে বিভিন্ন ফসলের বীজ, সার ও কীটনাশক দেয়া হবে, আর যদি ব্যাংক ঋণ প্রয়োজন হয়, তাহলে সহজ শর্তে সরকারী ভাবে ক্ষতিগ্রস্থদের ঋণ সহায়তাও প্রদান করা হবে।

অন্যদিকে জেলার ৭টি উপজেলায় সবজি ক্ষেত নষ্ট হওয়ার কারনে বাজারে সবজির দাম বেড়ে দাড়িয়েছে কেজি প্রতি ৪০ থেকে ৫০ টাকার উপরে। যা বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত সহ সাধারণ মানুষের ক্রয় ক্ষমতার বাহিরে। দ্রুত কৃষি প্রণোদনা পাওয়া না গেলে, শাক-সবিজর দাম আরো বাড়বে বলে মনে করছে কৃষি সংশ্লিষ্টরা।

আলীকদমের পানবাজারের সবজি বিক্রেতা শফিক জানান, চাহিদা অনুযায়ী সবজি পাওয়া যাচ্ছে না, চট্রগ্রাম থেকে যে সবজি গুলো বিক্রির জন্য আনছি দাম বেশি দিয়ে কিনতে হচ্ছে এবং এতে পরিবহন খরচ সহ সবকিছু মিলিয়ে বেশি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে।

বাংলাদেশ কৃষি কল্যাণ সমিতির সভাপতি মুজুবুর রহমান বলেন, এই বন্যায় আমার সবকিছু হারিয়ে গেছে। আমার মত আরো অনেক কৃষকের স্বপ্ন হারিয়ে গেছে। দ্রুত সরকারী সহযোগিতা প্রয়োজন, না হলে আমাদের মরতে হবে।

সর্বশেষ গত মঙ্গলবার পর্যন্ত বান্দরবান জেলা প্রশাসনের তথ্য মতে, জেলায় এপর্যন্ত ২ হাজার ১০৪ হেক্টর কৃষিজমি ও বাগান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে ৩৬৮ হেক্টর জমির ফসল সম্পূর্ণ নষ্ট হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের সংখ্যা প্রায় ৫ হাজার ৩২৩ জন।

এই বিষয়ে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক আবু নাঈম মো. সাইফুদ্দিন জানান, আমনের বীজতলা, আউশ, গ্রীষ্মকালীন সবজি ক্ষেত, আদা, হলুদ, ফল বাগান ও অন্যান্য ফসলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। প্রাথমিক হিসেবে প্রায় ৪ হাজার একর জমির ফসল নষ্ট হয়েছে।

এদিকে কৃষি সংশ্লিষ্টরা মনে করছে, দ্রুত বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত প্রকৃত কৃষকদের তালিকা তৈরী করে বীজ, সার ও প্রণোদনা দেওয়া হলে ফের ঘুরে দাঁড়াবে বান্দরবানের কৃষি খাত, আর তাতেই হাসি ফুটবে কৃষদের।

আরও পড়ুন