বান্দরবানে বন্যার ক্ষতের ক্ষতি কয়েকশ কোটি

টানা ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে বন্যার পর বান্দরবানে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির চিত্র সামনে আসছে, আর এই ক্ষতির পরিমান কয়েকশ কোটি ছাড়াবে বলে মনে করছে সংশ্লিষ্টরা।

জেলার বিভিন্ন উপজেলায় সড়ক, কালভার্ট, সেতু, পানি সরবরাহ ব্যবস্থা ও স্যানিটেশন, বৈদ্যুতিক সঞ্চালন লাইন, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্টান, কৃষি ফসলের চাষাবাদ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

বান্দরবান-রাঙ্গামাটি সড়কের ব্রীজঘাটা এলাকায় একটি সেতু ভেঙে পড়ায় দুই জেলার সড়ক যোগাযোগ এখনও সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। এছাড়া জেলার ৭টি উপজেলায় বিভিন্ন গ্রামীণ সড়ক ধসে পড়া, পাহাড়ি ঢলে ভেঙে যাওয়া এবং কালভার্ট ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কারণে স্থানীয় মানুষের চলাচল ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য পরিবহনে চরম দুর্ভোগ সৃষ্টি হয়েছে।

টংকাবতি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মাংয়াং মুরুং বলেন, ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলের কারণে লামা-সুয়ালক সড়কের টংকাবতি এলাকায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।

স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) সূত্রে জানা গেছে, বান্দরবান জেলায় এলজিইডির আওতায় প্রায় ৯০০ কিলোমিটার পাকা, কাঁচা ও ইউনিয়ন সড়ক রয়েছে। মাঠপর্যায়ের প্রাথমিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, অন্তত ২১ কিলোমিটার সড়ক ও ১৫টি কালভার্ট এবং অসংখ্য ছোট-বড় অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী প্রদীপ দেওয়ান জানান, প্রাথমিক প্রাপ্ত তথ্য অনুসারে প্রায় ৪০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে।

বান্দরবান সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের আওতায় রয়েছে প্রায় ৩২০ কিলোমিটার সড়ক। এর মধ্যে বান্দরবান-কেরাণীহাট-চট্টগ্রাম মহাসড়ক, বান্দরবান-রাঙামাটি-বাঙ্গালখালিয়া সংযোগ সড়ক এবং বান্দরবান-রোয়াংছড়ি সড়ক আছে।

সওজের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, প্রাথমিকভাবে অন্তত ৫৫ কিলোমিটার সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ধসে গেছে তিনটি আরসিসি সেতু ও সাতটি বেইলি সেতু। ক্ষতিগ্রস্ত সড়কগুলো দ্রুত সচল করতে স্বল্পমেয়াদে প্রায় ৭ কোটি টাকা এবং দীর্ঘমেয়াদে টেকসই পুননির্মাণে আরো প্রায় ৪০ কোটি টাকার প্রয়োজন হবে।

NewsDetails_03

বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের অধীনে রয়েছে ৩০০ কিলোমিটারের বেশি সড়ক এবং বিস্তৃত অবকাঠামো নেটওয়ার্ক। পাহাড়ি জনপদে নির্মিত পাকা, আধাপাকা ও কাঁচা সড়ক, সেতু, কালভার্ট এবং জনসেবামূলক স্থাপনাগুলোর বড় অংশই ক্ষতির মুখে পড়েছে।

জেলা পরিষদের নির্বাহী প্রকৌশলী পরাক্রম চাকমা বলেন, এখনও প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ করা সম্ভব হয়নি। প্রকৌশলীরা সরেজমিন পরিদর্শনের মাধ্যমে হিসাব প্রস্তুত করবে, তারপর ক্ষতির বাস্তব চিত্র পাওয়া যাবে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, জেলার এক হাজার ৯৮৯টি উন্নয়ন প্রকল্পে মোট এক হাজার ৩৮৬ কোটি ৯০ লাখ টাকার অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়েছে। এসব প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে গ্রামীণ সড়ক, সেতু, কালভার্ট, ধর্মীয়, শিক্ষাসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, হাট-বাজার এবং বাস টার্মিনাল।

বোর্ডের বান্দরবান ইউনিটের নির্বাহী প্রকৌশলী আবু বিন মোহাম্মদ ইয়াছির আরাফাত বলেন, সরাসরি পরিদর্শনের মাধ্যমে ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরি করা হবে। এখনই ক্ষতির হিসাব দেওয়া সম্ভব নয়।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক আবু নাঈম মো. সাইফুদ্দিন জানান, আমনের বীজতলা, আউশ, গ্রীষ্মকালীন সবজি ক্ষেত, আদা, হলুদ, ফল বাগান ও অন্যান্য ফসলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। প্রাথমিক হিসেবে প্রায় ৪ হাজার একর জমির ফসল নষ্ট হয়েছে।

জেলা প্রশাসক সানিউল ফেরদৌস জানান, জেলার ২২০টি আশ্রয় কেন্দ্রে ৬ হাজার ২৫০ জন আশ্রয় নেন। অন্তত ১৫ হাজার মানুষের বসতি পাঁচ দিন পানির নিচে ছিল। পাহাড় ধসে প্রাণ হারিয়েছেন ৬ জন। পানির স্রোতে ভেসে গেছে একজন। জেলার বিভিন্ন স্থানে অন্তত ২৬ পয়েন্টে পাহাড় ধসের ঘটনা ঘটে।

বর্তমানে সরকারি বিভিন্ন সংস্থার প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী এলজিইডি ও সওজের ক্ষতির পরিমাণই ৮০ কোটির বেশি। এর সঙ্গে পার্বত্য জেলা পরিষদ, পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল, দুই পৌরসভা, ইউনিয়ন পরিষদ ও অন্যান্য সরকারি অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতি যুক্ত করা হলে ও মাঠ পর্যায়ের পূর্নাঙ্গ তথ্য পাওয়া গেলে ক্ষতি কয়েকশ কোটি টাকা ছাড়াবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

উল্লেখ্য, টানা বর্ষন ও পাহাড়ী ঢলে গত ৭ জুলাই থেকে বান্দরবানে বন্যা দেখা দেয়। এতে পানিবন্দী হয়ে পড়ে প্রায় লক্ষাধিক মানুষ, পর্যটক ভ্রমনে ১৫ জুলাই পর্যন্ত নিষেধাজ্ঞা জারি করে প্রশাসন।##

আরও পড়ুন