বন বিভাগের বাধার মুখে কাপ্তাই সীতাঘাট মন্দিরের উন্নয়ন কাজ

স্থানীয়দের ক্ষোভ

রাঙামাটির কাপ্তাই উপজেলার ঐতিহাসিক সীতাঘাট মন্দিরের ভবন নির্মাণকাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে পার্বত্য চট্টগ্রাম দক্ষিণ বন বিভাগের বিরুদ্ধে। স্থানীয় সনাতনী সম্প্রদায়ের অভিযোগ, বিগত সরকারের সময়ে শুরু হওয়া উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ বর্তমান সময়ে এসে বন বিভাগের আপত্তির কারণে বন্ধ হয়ে গেছে। এতে স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ ও উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। তবে বন বিভাগের দাবি, সংরক্ষিত বনাঞ্চলে কোনো ধরনের স্থাপনা নির্মাণের অনুমতি নেই।

জানা গেছে, রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের অর্থায়নে প্রায় এক কোটি টাকা ব্যয়ে তিন অর্থবছর মেয়াদি প্রকল্পের আওতায় সীতাঘাট মন্দিরের ভবন নির্মাণকাজ শুরু হয়। ইতোমধ্যে প্রকল্পের প্রায় ৬০ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হলেও বন বিভাগের আপত্তিতে কাজ বন্ধ রয়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, একই এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে সীতা মন্দির, নাট্যমন্দির, শিব মন্দির এবং নদীতীরে গঙ্গা মন্দিরসহ একাধিক স্থাপনা রয়েছে। তাহলে নতুন ভবন নির্মাণে আপত্তি কেন—এমন প্রশ্ন তুলেছেন তারা। তাদের দাবি, সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে বাধা দিয়ে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করা হচ্ছে।
সীতা মন্দিরের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ শ্রীমৎ স্বামী জ্যোতির্ময়ানন্দ মহারাজ জানান, প্রায় ২৬ বছর আগে সীতা পাহাড়ের নাম অনুসারে মন্দিরটি প্রতিষ্ঠিত হয়। রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের অর্থায়নে ভবন নির্মাণের কাজ শুরু হওয়ার পর বেইজ ঢালাইসহ প্রায় ৬০ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। এরপর কাপ্তাই বন বিভাগের পক্ষ থেকে কাজ বন্ধ করে দেওয়া হয়। তিনি বলেন, “যদি এটি সংরক্ষিত বন হয়ে থাকে, তাহলে ২০২২ সালে কাজ শুরু হওয়ার সময় কেন বাধা দেওয়া হয়নি? তখন বাধা দিলে সরকারের এত টাকা ব্যয় হতো না।”

এ বিষয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম দক্ষিণ বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা এস. এম. সাজ্জাদ হোসেন বলেন, “সরকারি সংরক্ষিত বনাঞ্চলে কোনো ধরনের স্থাপনা নির্মাণ করা যাবে না। সীতা পাহাড় সংরক্ষিত বনাঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত। তাই এখানে ভবন নির্মাণের অনুমতি দেওয়া হবে না।” তিন বছর আগে কাজ শুরু হওয়ার সময় কেন কার্যকরভাবে বাধা দেওয়া হয়নি—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, তখনও আপত্তি জানানো হয়েছিল। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে চিঠির মাধ্যমে বিষয়টি অবহিত করা হয়েছে। ব্যাঙছড়ি এলাকায় এলজিইডির একটি সড়ক নির্মাণকাজও বন্ধ রাখা হয়েছে বলে তিনি জানান।

কাপ্তাই উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান দিলদার হোসেন বলেন, সীতা পাহাড়, সীতাঘাট ও সীতা মন্দির দীর্ঘদিন ধরে এ এলাকার ঐতিহ্যের অংশ। এটি সনাতন ধর্মাবলম্বীদের একটি গুরুত্বপূর্ণ তীর্থস্থান। প্রতি বছর দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ভক্তরা এখানে পূজা-অর্চনা করতে আসেন।

NewsDetails_03

তিনি বলেন, একটি অব্যবহৃত জায়গায় ভবন নির্মাণের প্রায় ৬০ শতাংশ কাজ শেষ হওয়ার পর হঠাৎ কাজ বন্ধ করে দেওয়ায় এলাকায় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে।

জানা যায়, ২০২২-২০২৩ অর্থবছরে তিন বছর মেয়াদি প্রকল্প হিসেবে সীতাঘাট মন্দির ভবনের নির্মাণকাজ শুরু হয়। কাপ্তাইয়ের ঠিকাদার আক্তার হোসেন মিলনের প্রতিষ্ঠান ‘পাইশি এন্টারপ্রাইজ’ কাজটি বাস্তবায়ন করছে। ঠিকাদার জানান, প্রকল্পের মেয়াদ এক বছর বাড়ানো হলেও বন বিভাগের বাধার কারণে অবশিষ্ট কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব হচ্ছে না। এতে তিনি যেমন আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, তেমনি সরকারের বিনিয়োগও অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।

কাপ্তাই সীতাঘাট মন্দির পরিচালনা কমিটির সভাপতি সমলেন্দু বিকাশ দাশ বলেন, “চলমান প্রকল্প হঠাৎ কেন বন্ধ করে দেওয়া হলো, তা আমাদের বোধগম্য নয়। এটি হিন্দু সম্প্রদায়ের একটি ঐতিহাসিক তীর্থস্থান। প্রতিদিনই ভক্তরা এখানে আসেন। আমরা দ্রুত অসমাপ্ত ভবনের কাজ শেষ করার দাবি জানাই।”

রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের সহকারী প্রকৌশলী উজ্জ্বল দেওয়ান বলেন, প্রকল্প অনুমোদনের আগেই সেখানে একাধিক স্থাপনা ছিল। বাজেট সংকুলানের কারণে তিন বছর মেয়াদি প্রকল্প নেওয়া হয়। ইতোমধ্যে ঠিকাদার প্রায় ৬০ লাখ টাকার বিল উত্তোলন করেছেন।

তিনি বলেন, “তিন বছর আগে যদি বন বিভাগের আপত্তির বিষয়টি স্পষ্ট করা হতো, তাহলে সরকারি অর্থ এখানে ব্যয় হতো না। এখন কাজ বন্ধ থাকায় সরকারের অর্থের যথাযথ ব্যবহারও ব্যাহত হচ্ছে এবং এলাকায় সম্প্রীতির পরিবেশ নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।”

আরও পড়ুন