আলীকদমের দর্শনীয় স্থান যেগুলো

সৃষ্টির এক অপরুপ সৌন্দর্যের লীলাভূমি বান্দরবান পার্বত্য জেলা। ভ্রমণপিপাসু মানুষের কাছে আলীকদম যেনো অন্য এক নাম। জেলার দক্ষিণ প্রান্তে এই উপজেলা। সারি সারি বৃক্ষরাজি আচ্ছাদিত সবুজ গালিচার মধ্যে আঁকাবাঁকা পাহাড়ি পথ দিয়ে যেতে যেতে হারিয়ে যাবেন একের পর এক সৌন্দর্যে ভরপুর দর্শনীয় স্থানে।

প্রতিবছরই দেশি বিদেশি পর্যটকরা ছুটে আসছেন আলীকদমে। পাহাড়ের বুকে বরাবরই ফুটে উঠেছে আলীকদম উপজেলার দর্শনীয় স্থানগুলো। তবে, যোগাযোগ সুবিধা না থাকায় এ উপজেলায় এ যাবত তেমন কোনো পর্যটন শিল্প গড়ে উঠেনি।

আয়তনঃ-
আলীকদম উপজেলার আয়তন ৮৮৫.৭৮ বর্গ কিলোমিটার (২,১৮,৮৮০ একর)। এটি বান্দরবান জেলার দ্বিতীয় বৃহত্তম উপজেলা।

অবস্থানঃ-
বান্দরবান জেলার দক্ষিণাংশে ২১°২১´ থেকে ২১°৫০´ উত্তর অক্ষাংশ ৯২°১৫´ থেকে ৯২°৩৪´ পূর্ব দ্রাঘিমাংশ জুড়ে আলীকদম উপজেলার অবস্থান। বান্দরবান জেলা সদর থেকে এ উপজেলার দূরত্ব প্রায় ১১১ কিলোমিটার। এ উপজেলার পূর্বে ও উত্তর-পূর্বে থানচি উপজেলা, উত্তর-পশ্চিমে লামা উপজেলা, পশ্চিমে ও দক্ষিণ-পশ্চিমে নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা এবং দক্ষিণ-পশ্চিমে ও দক্ষিণে মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশ অবস্থিত।

নামকরণঃ-

আলোহক্যডং থেকে আলীকদম নামের উৎপত্তি। বোমাং সার্কেল চীফের নথিপত্র ও ১৯৬৩ সালের তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান সরকার কর্তৃক আঁকা মানচিত্রে আলোহক্যডং নামের সত্যতা পাওয়া যায়। বিশিষ্ট সাংবাদিক ও গবেষক আতিকুর রহমান এর মতে, আলী পাহাড়ের সাথে সঙ্গতিশীল নাম হল আলীকদম। তাছাড়া কথিত আছে যে, ৩৬০ আউলিয়া এ উপমহাদেশে ইসলাম প্রচারের জন্য এসেছিলেন। তাদের মধ্যে আলী নামে কোন এক সাধক এ অঞ্চলে আসেন। ওনার পদধুলিতে ধন্য হয়ে এ এলাকার নাম করণ হয় আলীকদম। পূর্ববর্তী সময়ে এটি লামা উপজেলার একটি ইউনিয়ন ছিল। ১৯৭৬ সালে লামা ও নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার কিছু এলাকা নিয়ে আলীকদম থানা প্রতিষ্ঠা করা হয়। ১৯৮৩ সালে বাংলাদেশ সরকার প্রশাসন বিকেন্দ্রীকরণের ফলে এটি উপজেলায় অধিষ্ঠিত হয়। এ উপজেলায় বর্তমানে ৪টি ইউনিয়ন রয়েছে। সম্পূর্ণ আলীকদম উপজেলার প্রশাসনিক কার্যক্রম আলীকদম থানার আওতাধীন। আলীকদম উপজেলার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে মাতামুহুরী নদী। এছাড়া রয়েছে তৈন খাল এবং চৈক্ষ্যং খাল।

দর্শনীয় স্থানঃ-
মারাইংতং পাহাড়, আলীর সুড়ঙ্গ, তাংমাইন ঝর্ণা, পালংখিয়ং, লাদ মেরাখ ঝর্ণা, ক্রিসতং পাহাড়, রংরাঙ পাহাড়, চাইম্প্রা ঝর্ণা, দামতুয়া ঝর্ণা, ডিম পাহাড়, রুপমুহুরী ঝর্ণা, শিলবুনিয়া ঝর্ণা ও রোয়াম্ভূ নোনার ঝিড়ি ঝর্ণা।

🔴➢আলীর সুড়ঙ্গ
আলীকদম উপজেলা সদর থেকে মাত্র ৩ কিলোমিটার দূরেই মাতামুহুরী-তৈন খাল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা দু‘পাহাড়ের চূঁড়ায় প্রাকৃতিক ভাবে সৃষ্ট আলীর গুহা বা আলীর সুড়ঙ্গ। এ পাহাড়েই রহস্যজনক ৪টি সুড়ঙ্গের অবস্থান। প্রকৃতির অপরূহ এই গুহাকে ঘিরে রহস্যের যেনো শেষ নেই।

🔴➢মারাইনতং জাদি
আলীকদম উপজেলা সদর হতে প্রায় ১৬ কিলোমিটার দূরে আলীকদম-লামা উপজেলার সীমান্তবর্তী মিরিঞ্জা পাহাড়ে মারাইনতং নামের পাহাড় চূড়ার অবস্থান। এর উচ্চ সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১৬০০ ফুট। পাহাড় চূড়ায় ১৯৯২ সালে পূজনীয় ভিক্ষু সংঘের উদ্যোগে এবং স্থানীয় পুণ্যার্থীদের সহযোগিতায় বৌদ্ধমূর্তি প্রতিষ্ঠা, জাদী নির্মাণ করা হয়। স্থাপিত বৌদ্ধ জাদীকে কেন্দ্র করে প্রতি বছর মারাইনতং মহা বৌদ্ধ মেলা ও বৌদ্ধ ধর্মীয় উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। এ উৎসবে পার্শ্ববর্তী দেশসমূহ থেকে অসংখ্য বৌদ্ধ ভিক্ষু, পুণ্যার্থী ও পযটকদের সমাগম ঘটে। আলীকদম উপজেলার আবাসিক এলাকা হয়ে এই পাহাড়ে যেতে হয়।

🔴➢ডিম পাহাড়
আলীকদম-থানচি সড়কের ২৩ কিলোমিটার পয়েন্টে এ সড়কের পাশে সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৩,০০০ ফুট উঁচু পাহাড় অবস্থিত। ডিম্বাকৃতির ন্যায় এই পাহাড়কে ‘ডিম পাহাড়’ নামে অভিহিত করা হয়। অধিকাংশ সময় মেঘে ঢাকা ও আকাশছোঁয়া এ পাহাড় দেশী-বিদেশী পযটকদের আকৃষ্ট করেছে।

🔴➢রূপমুহুরী ঝর্ণা
আলীকদম সদর হতে প্রায় ৫০ কিমি দূরে পোয়ামুহুরী নামক স্থানে এ ঝর্ণাটির অবস্থান। নৌকা পথে কিংবা মোটরসাইকেল যোগে যাওয়া যায়।

আলীকদমের আলীর সুড়ঙ্গ। ছবি-পাহাড়বার্তা

🔴➢দামতুয়া ঝর্ণা
ঝর্ণাটি মুরং ভাষায়, যে ঝিরিতে অবস্থিত তাকে তুক অ বলে। তুক অর্থ ব্যাঙ এবং অ অর্থ ঝিরি। তুক অ অর্থ ব্যাঙ ঝিরি। ডামতুয়া অর্থ খাড়া আকৃতির দেয়াল যা বেয়ে ব্যাঙ বা মাছ উপরে উঠতে না পারে। ওয়াজ্ঞাপারাগ অর্থ পাহাড় বা উচুঁ স্থান থেকে পানি পড়া। তুক অ ডামতুয়া ওয়াজ্ঞাপারাগ সহ ঝর্ণাটিকে একাধিক নামে ডাকা হয়। আলীকদম থানচি রোডে ১৭ কিলোতে আদুপাড়া নামক স্থান থেকে যেতে হয়।

🔴➢তাংমাইন ঝিড়ি ঝর্ণা, পালঙকিয়ং ঝর্ণা এবং লাদ মেরাখ
এই দুটি ঝর্ণা আলীকদম উপজেলার ৪ নং কুরুকপাতা ইউনিয়নের অন্তর্গত। মূলত তৈনখালে এই তিনটি ঝর্ণা। আলীকদম সদর আমতলী লংঘাট নামক স্থান থেকে নৌকা/ইঞ্জিনচালিত বোট দিয়ে দেড় ঘন্টা গেলে দৌছড়ি বাজার। দৌছড়ি বাজার থেকে নদী পথে তাংমাইন ঝর্ণা, এরপর পালংখিয়ং এবং লাদ মেরাখ।

🔴➢রংরাং পাহাড়
স্থানীয় তঞ্চঙ্গ্যা সম্প্রদায়ের মানুষরা তাদের মাতৃভাষায় ধনেশ পাখিকে রংরাং/অরআঙ নামে ডাকে। একটা সময় এই পাহাড়ে প্রচুর পরিণাম ধনেশ পাখির ডাক শুনা যেতো। শিকার করার কারণে পাখিটি বিলুপ্তির পথে। এই পাখির নাম অনুসারে অরআঙ/ রংরাং পাহাড় ডাকা হয়। এই পাহাড়টি থানচি আলীকদম উপজেলার সিমান্তবর্তী এলাকায় পূর্বদিকে অবস্থিত। এই পাহাড়ে উঠলেই সূর্য অস্ত্র যাওয়া খুব সুন্দরভাবে দেখা যায়। চারপাশে পাহাড় আর পাহাড়, পাশে থানচি এবং আলীকদম উপজেলা। পাহাড়ের এই মনোরম পরিবেশ আপনাকে বরাবরই মুগ্ধ করে তুলবে। আলীকদম উপজেলা তৈনখালের দৌছড়ি বাজার হয়ে এই পাহাড়ে যেতে হয়।

🔴➢ক্রিসতং পাহাড়
গভীর জঙ্গল আর পাহাড় হওয়ায় এই জায়গাটি পর্যটকদের কাছে একটি আকর্ষণীয় স্থান। মূলত ম্রো সম্প্রদায়ের লোকজন একটি পাখির নামানুসারে ক্রিসতং পাহাড়ের নাম রাখে। রংরাং পাহাড়ের পাশে রয়েছে ক্রিসতং পাহাড়। পাহাড়ের এই জায়গাটি অধিকাংশ সময় মেঘে ডাকা থাকে। তাই এই পাহাড়টি মেঘের পাহাড় হিসেবেও পরিচিত। এই পাহাড়টি রংরাঙ পাহাড় এর কাছাকাছি একি রাস্তায়।

🔴➢যেভাবে যাবেন
ঢাকা-চট্টগ্রাম থেকে বাস যোগে সরাসরি আলীকদম আসতে পারবেন। কিংবা কক্সবাজার থেকে চকরিয়া এসে বাস অথবা চাঁদের গাড়ি নিয়ে আলীকদম বাস স্টেশনে। তারপর থানচি রোড ১৭ কিলোতে গিয়ে পায়ে হেঁটে তিনঘণ্টা গেলে দামতূয়া ঝর্ণা এবং থানচি সড়কে ডিম পাহাড়সহ বিভিন্ন ভিউ পয়েন্ট।অন্যদিকে আমতলী লং ঘাট হয়ে ইঞ্জিন চালিত নৌকায় দেড় ঘন্টায় দৌছড়ি বাজার। সেখান থেকে তাংমাইন ঝর্ণা, লাদমেরাখ, পালংখিয়ং, সাইম্প্রা, রংরাঙ এবং ক্রিসতং পাহাড় ঘুরে আসতে পারবেন।

আরও পড়ুন
আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না।