রুমাবাসীর স্বপ্ন বাস্তবায়নে বীর বাহাদুরের আন্তরিকতার অভাব নেই : পাহাড়বার্তাকে রুমা সাংগু কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ সুই প্রুচিং মার্মা

রুমা সাংগু কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ সুই প্রুচিং মার্মা এর একান্ত সাক্ষাতকার নিচ্ছেন পাহাড়বার্তার বিশেষ প্রতিনিধি (রুমা) বান্দরবান এর শৈহ্লা চিং মার্মা
বান্দরবান পার্বত্য জেলার রুমা উপজেলায় একমাত্র উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রুমা সাংগু কলেজ। ডিজিটাল বাংলাদেশের রূপকার ও বর্তমান সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মহানুভবতা ও পার্বত্য প্রতিমন্ত্রী বীর বাহাদুর উশৈসিং এমপি এর ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় কলেজটি ফের চালু হয় ২০১৪ সালে। একটি কলেজ নির্মান, যেখানে রুমাবাসীর দীর্ঘদিনের স্বপ্ন ছিল, সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রুপ দিতে কোটি কোটি টাকা অর্থ বরাদ্ধ দিয়ে আন্তরিক ভাবে কলেজটিকে এগিয়ে নিতে কাজ করছে প্রতিমন্ত্রী বীর বাহাদুর।
তিনি (বীর বাহাদুর) শুধু চান পরীক্ষায় এ কলেজের ভাল ফলাফল। আর আমরা ভালো ফলাফলের জন্য কাজ করে যাচ্ছি। পাহাড়বার্তার বিশেষ প্রতিনিধি (রুমা) বান্দরবান এর শৈহ্লা চিং মার্মাকে একান্ত সাক্ষাতকারে কথাগুলো বলছিলেন বান্দরবানের রুমা উপজেলার রুমা সাংগু কলেজে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ সুই প্রুচিং মার্মা।
গত সাড়ে তিন বছরে প্রায় তিন কোটি টাকার ব্যয়ে প্রশাসনিক ভবনসহ অবকাঠামোগত বিভিন্ন স্থাপনার উন্নয়নের কাজ হয়েছে। জেলা থেকে দূর্গম উপজেলা হলেও এ কলেজ থেকে দ্বিতীয় ব্যাচ ২০১৭সালে ২৭জন এইচ.এসসি পরীক্ষায় অংশ গ্রহণ করে ১৮জন উত্তীর্ণ হয়েছে, যা শতকরা ৬৭ভাগ শিক্ষার্থী। আগামি পাঁচ বছরে হয়তো শতভাগ শিক্ষার্থী পাস করবে, এমন উদ্যোগ ও আশা নিয়ে দৈনন্দিন নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন রুমা সাংগু কলেজের কর্মরত শিক্ষক ও কর্মচারীরা।
গত শনিবার (১২মে) দুপুরে অধ্যক্ষের কার্যালয়ে তাঁর সাথে এক সাক্ষাৎকারে খোলা মেলায় আলাপচারিতায় ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ সুই প্রুচিং মার্মা এসব কথা বলেছেন।
কলেজ প্রতিষ্ঠা ও সুযোগ-সুবিধা সম্পর্কে পাহাড়বার্তা‘কে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ বলেন, রুমা সাংগু কলেজটি বিগত ২০০০সালে স্থাপিত হলেও দেশের অভ্যন্তরে বিরাজমান রাজনৈতিক অস্থিরতা ও কলেজের নিজস্ব তহবিলে অর্থ সংকটসহ নানান প্রতিকূলতার কারণে বন্ধ হয়ে যায়। দীর্ঘ ১২বছর পর ২০১৪সালে পুনরায় এর কার্যক্রম চালু হয়। পূনরায় চালু হয়ে অতি অল্প সময় হলেও আমাদের এ কলেজটির অবকাঠামোসহ সার্বিক উন্নয়ন চিত্র সত্যিই লক্ষণীয় ও প্রশংসার দাবিদার। কেননা, এলাকার পাহাড়ি-বাঙ্গালি বিভিন্ন সম্প্রদায় মিলে অর্ধশতাধিক কম খরচে শিক্ষার্থী এ কলেজে পড়ালেখা করছে। এ ক্যাম্পাসে বর্তমানে ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য আলাদা করে দ্বিতল ভবন দুইটি হোস্টেল, যেখানে ৮০জনের বেশি শিক্ষার্থী থাকা যায়। একটি দ্বিতল ভবন শিক্ষক ডরমটরি ও একটি পুরাতন একাডেমিক ভবন আছে। আর তিন তলা বিশিষ্ট একাডেমিক একটি ভবন নির্মাণাধীন রয়েছে।
ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ সুই প্রুচিং মার্মা মারমা পাহাড়বার্তাকে বলেন, রুমা সাংগু কলেজে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হিসেবে যোগদানের পরবর্তী অর্থাৎ তিন বছর আগে কলেজের সার্বিক উন্নয়ন কাজ নিয়ে পার্বত্য প্রতিমন্ত্রীর বাসায় যান। তখন পার্বত্য প্রতিমন্ত্রী আমাকে (ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ) বলেছিলেন, প্রধানমন্ত্রীর এক ঘোষণায় রুমা সাংগু কলেজ প্রতিষ্ঠা হয়েছে। এ কলেজের প্রতি আমার (প্রতিমন্ত্রী) আন্তরিকতা কোনো অভাব নেই। প্রাতিষ্ঠানিক ও সার্বিক উন্নয়নসহ সামনে তিন বছরে প্রয়োজনে আরো তিন কোটি টাকার উন্নয়ন কাজ করবেন বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তিনি।
পার্বত্য প্রতিমন্ত্রী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের বিষয়ে সুই প্রুচিং মার্মা হিসাব দেখিয়ে এ প্রতিবেদকে বলেন, গত আড়াই বছরে পার্বত্য প্রতিমন্ত্রী বীর বাহাদুর উশৈসিং এমপি তাঁর সঠিক নির্দেশনা ও আন্তরিক সহযোগিতায় পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের মাধ্যমে ইতোমধ্যে দুই কোটি ২৬লক্ষ টাকার কাজ উন্নয়ন হয়েছে, আরো প্রক্রিয়াধীন আছে। তাছাড়াও শিক্ষা বিভাগ থেকে একটি একাডেমিক ভবনের কাজ শুরু হচ্ছে। প্রথম তলা ভবন নির্মানের বরাদ্ধ ৭৫লক্ষ টাকা। পর্যায়ক্রমে ভবনটি চার তলা হবে। এ ভবনের পাশেই উন্নয়ন বোর্ডের বাস্তবায়নে ৯লক্ষ টাকার ব্যয়ে একটি শহীদ মিনার হচ্ছে। যেটি রুমা উপজেলার সবচেয়ে বড় ও উন্নতমানের শহীদ মিনার হবে। এসব স্থাপনাসহ কলেজ ভবনগুলোর পরিবেষ্টিত ফুলের বাগান ও ফলজে বৃক্ষরাজি রুমা সাংগু কলেজের সৌন্দর্যকে ভিন্ন মাত্রায় যোগ করেছে। তবে পার্বত্য প্রতিমন্ত্রী শুধু পরীক্ষায় এ কলেজের ভাল ফলাফল চান।
এক প্রশ্নের জবাবে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ পাহাড়বার্তাকে তিনি আরো বলেন, যেকোনো কাজ ভাল করতে হলে সঠিক পরিকল্পনায় সময় নিয়ে উদ্যোগ নিতে হয়। তাই ১০বছরের জন্য উদ্যোগ নিয়েছি, সাড়ে তিন বছর হয়ে গেছে। ২০১৮সাল, এবার এইচ.এসসি পরীক্ষায় ৪৩জন পরীক্ষার্থী ইতোমধ্যে অংশ গ্রহণ করে পরীক্ষা সম্পন্ন করেছে। রুমা সাংগু কলেজ থেকে ২০১৬সালে এইচএসসি চূড়ান্ত পরীক্ষায় ৩০জনের মধ্যে মাত্র ৯জন পাস করে। ২০১৭সালে ২৭জনের মধ্যে পাস করেছে ১৮জন, যা শতকরা ৬৭ভাগ শিক্ষার্থী। এভাবে আগামি ১০বছরে হয়তো শতভাগ পাস করে সাফল্য অর্জন করবে। বর্তমানে এ কলেজে অর্ধশতাধিক শিক্ষার্থী লেখা পড়া করছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
কলেজের প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়ন ও কর্মরত শিক্ষকের সম্পর্কে প্রশ্নের জবাবে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ সুই প্রুচিং মার্মা বলেন, রুমা সাংগু কলেজটি বর্তমানে সরকারিকরণের প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। সম্ভবত; চলতি বছর ৩০জুনের মধ্যে পুরোপুরি সরকারি হয়ে যেতে পারে। একারণে গত ১০মাস যাবত নিয়মিত বেতন-ভাতার সমস্যায় ভূগছেন শিক্ষকেরা। তবে এ কলেজে কর্মরত ১১জন শিক্ষক ও ৩জন কর্মচারি মোট ১৩জন লোকের নিয়মিত যথাসাধ্য কাজ করে যাচ্ছেন এটা আসল কথা।
প্রতিষ্ঠানের প্রধান হিসেবে ভাল-মন্দ অনুভূতির সম্পর্কে জানতে চাইলে সুই প্রুচিং মার্মা আরো বলেন ,যখন কোন সহকর্মী দায়িত্ব থাকা সত্ত্বেও তা অবহেলা করেন, তখন মনে কষ্ট পাই। আর যথাসময়ে কোনা কাজ সম্পন্ন করে ফেলেন, তখন খুব সন্তুষ্টি অনুভব করি। তবে এখানে উল্লেখ করার মতো, এ পর্যন্ত কোনো মন্দের কাজ হয়নি। সবসময় শিক্ষকেরা মিলে মিশে দায়িত্ব পালন করে আসছে। অতএব কারোর প্রতি দৃষ্টিকটু সুযোগ নেই।
কলেজে পাঠদান ও শিক্ষার্থী ভর্তি ব্যাপারে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ বলেন, প্রতি বছর রুমা থেকে যেসব শিক্ষার্থী এসএসসি ভাল গ্রেড পয়েন্টে পাস করছে, তুলনামূলক আর্থিক অবস্থা ভাল । তারা সবাই রুমা সাংগু কলেজে ভর্তি না হয়ে দূরে অন্যত্র চলে যায়। কম গ্রেডে পাস করা শিক্ষার্থীরা এখানে ভর্তি হয়ে পড়ালেখা করছে । কলেজে মানবিক ও ব্যবসা শিক্ষা এ দুইটি বিভাগ আছে। শ্রেণি কক্ষে একেবারে বাসায় প্রাইভেট পড়ানোর মত পাঠদান করা হয়,সাপ্তাহিক পরীক্ষা নেয়া হয়। তারপরও প্রাক নির্বাচনী পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া শিক্ষার্থীদের চূড়ান্ত পরীক্ষায় অংশ নিলে তাদের ফলাফল ভাল আশা করা যায়।
প্রসঙ্গত; সুই প্রুচিং মার্মা। ১৯৮৩ সালে বান্দরবান পার্বত্য জেলার রুমা উপজেলায় পাইন্দু ইউনিয়নের মুলপি পাড়ায় মারমা পরিবারে তাঁর জন্ম। শৈশবকালে দুর্গম এলাাকায় বেড়ে ওঠেছেন তিনি। তবে ১৯৯৮সালে বান্দবানের ডনবস্কো উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করার পর ঢাকা নটরডেম কলেজে ভর্তি হন। এ কলেজ থেকে ২০০০সালে এইচ.এসসি উত্তীর্ণ হন।
২০০৫সালে জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি বিষয়ে বি.এ অনার্স ও মাষ্টার্স ডিগ্রী অর্জন করেন। তারপর কিছুদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে একটি গবেষণা কাজে নিয়োজিত থাকার পর ঢাকায় সাভারে জ্যোতি বিদ্যা নিকেতন উচ্চ বিদ্যালয়ে উপাধ্যক্ষ হিসেবে যোগ দিয়ে সফলতার সাথে সাড়ে ৯বছর দায়িত্ব পালন করেন। বান্দরবানের নিজ জন্ম ভূমি রুমা উপজেলায় একমাত্র উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তখন-ই সদ্য পূন;প্রতিষ্ঠিত রুমা সাংগু কলেজে ২০১৪সালে ফেব্রুয়ারি মাসে প্রভাষক হিসেবে যোগদান করেন। তখন থেকে অদ্যাবধি ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হিসেবে স্বীয় দায়িত্ব পালন করে আসছেন।

আরও পড়ুন
Loading...