কাপ্তাই জাতীয় উদ্যানে দেড় কোটি টাকার সোলার ফেন্সি অকার্যকর
বাড়ছে হাতি ও মানুষের দ্বন্দ্ব
রাঙামাটির কাপ্তাই জাতীয় উদ্যানে বন্য হাতির লোকালয়ে প্রবেশ ঠেকাতে প্রায় দেড় কোটি টাকা ব্যয়ে স্থাপন করা আট কিলোমিটার দীর্ঘ সোলার ফেন্সি (বিদ্যুৎচালিত বেড়া) এখন বেশির ভাগই অকার্যকর হয়ে পড়েছে। ফেন্সির তার ছিঁড়ে যাওয়া, ব্যাটারি ও বিভিন্ন সরঞ্জাম চুরি এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগে তারের ওপর গাছের ডালপালা ও লতাপাতা পড়ে যাওয়ায় এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। ফলে বন থেকে বন্য হাতি লোকালয়ে ঢুকে পড়ায় হাতি-মানুষের দ্বন্দ্বের আশঙ্কা বাড়ছে।
পার্বত্য চট্টগ্রাম দক্ষিণ বন বিভাগের কাপ্তাই রেঞ্জ সূত্রে জানা যায়, বন্য হাতির লোকালয়ে প্রবেশ ঠেকাতে ২০২৩ সালে কাপ্তাই জাতীয় উদ্যানের প্রায় আট কিলোমিটার এলাকায় সোলার ফেন্সি স্থাপন করা হয়। এ প্রকল্পে ব্যয় হয় প্রায় দেড় কোটি টাকা। এর উদ্দেশ্য ছিল, পার্শ্ববর্তী বনাঞ্চল থেকে বন্য হাতি লোকালয়ে এসে বসতবাড়ি ও ফসলের ক্ষতি করা এবং মানুষের সঙ্গে হাতির সংঘাত কমানো।
স্থানীয় বাসিন্দা ও বন বিভাগের সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত এক যুগে কাপ্তাই এলাকায় বন্য হাতির আক্রমণে প্রায় ১২ থেকে ১৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন আরও অনেকে। হাতির আক্রমণে বসতবাড়ি ও ফসলের ক্ষয়ক্ষতিও হয়ে থাকে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে সরকারি নিয়ম অনুযায়ী বন বিভাগ থেকে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়।
তবে সোলার ফেন্সি স্থাপনের এক বছরের মধ্যে এর ব্যাটারিসহ কিছু সরঞ্জাম চুরি হয়ে যায় বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। এরপর বিভিন্ন সময়ে প্রাকৃতিক দুর্যোগে ফেন্সির তারের ওপর গাছের ডালপালা ও লতাপাতা পড়ে এবং অনেক জায়গায় সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। কয়েক দফা মেরামত করা হলেও পুরোপুরি কার্যকর করা সম্ভব হয়নি।
নিয়ম অনুযায়ী, প্রতিদিন বিকেল পাঁচটা থেকে পরদিন ভোর ছয়টা পর্যন্ত সোলার ফেন্সি চালু রাখার কথা। এ জন্য নিয়মিত একজন কর্মী থাকার কথা থাকলেও বাস্তবে সেই ব্যবস্থা কার্যকর নেই বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।

সম্প্রতি বিশ্ব হাতি দিবস উপলক্ষে কাপ্তাইয়ে আয়োজিত আলোচনা সভায় সোলার ফেন্সি অকার্যকর হয়ে পড়ার বিষয়টি উঠে আসে। সেখানে দ্রুত ফেন্সিটি সংস্কার ও কার্যকর করার দাবি জানানো হয়।
কাপ্তাই উপজেলা বিএনপির সভাপতি লোকমান আহমেদ বলেন, ‘কোটি টাকা ব্যয়ে স্থাপন করা সোলার ফেন্সির বেশির ভাগ জায়গায় তার ছিঁড়ে গেছে। তারের ওপর গাছের ডালপালা ও লতাপাতা পড়ে আছে। ফেন্সি চালু না থাকায় বন্য হাতি আবার লোকালয়ে চলে আসছে। এতে হাতি-মানুষের দ্বন্দ্ব বাড়ছে। দ্রুত সোলার ফেন্সি মেরামত করে চালু করা প্রয়োজন।’
বাংলাদেশ সুইডেন পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের কর্মচারী সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা এলাকায় হাতির আতঙ্কের মধ্যে আছি। সোলার ফেন্সি দ্রুত মেরামত করা দরকার।’
কাপ্তাইয়ের বনশিল্প এলাকায় রাতে কর্মরত নৈশপ্রহরী বাহার ও আফছার বলেন, ‘কারখানার চারপাশে সোলার ফেন্সি রয়েছে। কিন্তু সেটি বিকল হয়ে পড়ে আছে। তারগুলোও এলোমেলো হয়ে গেছে। দ্রুত এটি সংস্কার করা দরকার।’
এ বিষয়ে বন বিভাগের কাপ্তাই রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. মামুনুর রহমান বলেন, ‘সোলার ফেন্সির অনেক জায়গা নষ্ট রয়েছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে তারের ওপর ডালপালা পড়ে কিছু সমস্যা হয়েছে। আমরা বেশ কিছু জায়গায় মেরামত করেছি। তবে পুরোপুরি সংস্কারের জন্য বর্তমানে কোনো বাজেট নেই। বাজেট পাওয়া গেলে ফেন্সিটি মেরামত করা হবে।’
স্থানীয়দের আশঙ্কা, সোলার ফেন্সি দীর্ঘদিন অকার্যকর থাকলে বন্য হাতির লোকালয়ে প্রবেশ আরও বাড়তে পারে। এতে ফসল ও বসতবাড়ির ক্ষয়ক্ষতির পাশাপাশি মানুষ ও হাতি—উভয়ের নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়বে। তাই দ্রুত ফেন্সিটি সংস্কার করে নিয়মিত চালু রাখার ব্যবস্থা করার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।


