দুর্গম পাহাড় পেরিয়ে হাটে হাটে পাহাড়ি নারীদের জীবনের গল্প
ভোরের আলো ফুটতেই খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গার কালা পাহাড়ে শুরু হয় পাহাড়ি নারীদের ব্যস্ততা। হাতে দা, পিঠে বাঁশের ঝুড়ি দুর্গম পাহাড় বেয়ে তারা খুঁজে ফেরেন প্রাকৃতিক ভাবে জন্মানো ঝাড়ু ফুল। কখনো খাড়া পাহাড়, কখনো গহীন জঙ্গলপথ পেরিয়ে সংগ্রহ করা এই ঝাড়ু ফুলই তাদের জীবিকার প্রধান ভরসা।
শনিবার হাটবারে মাটিরাঙ্গা বাজারে গেলে দেখা যায় সেই পাহাড়েরই প্রতিচ্ছবি। সারি সারি ঝাড়ু ফুলের আটি সাজিয়ে বসেছেন পাহাড়ি নারী ও পুরুষেরা। কারও কাঁধে ঝুড়ি, কারও পাশে বাঁধা ঝাড়ুর আঁটি।
ক্রেতা-বিক্রেতার দরকষাকষিতে মুখর হাটবাজার।
স্থানীয়রা জানান, একটি ঝাড়ু ফুলের কাঠি বিক্রি হয় ১ টাকা দরে। ১২টি কাঠি দিয়ে তৈরি হয় এক আটি, যার দাম ১২ টাকা। সাধারণত ২০ থেকে ৩০টি শলাকা ফুল দিয়ে একটি ঝাড়ুর আটি বাঁধা হয়। আকার ও মানভেদে প্রতিটি আটি ২০ থেকে ৩০ টাকায় বিক্রি হয়।
কালা পাহাড় ছাড়াও মাটিরাঙ্গার আটবাড়ি, ১০ নম্বর ইসলামপুর, রসুলপুর ও আলুটিলা এলাকার পাহাড় থেকে ঝাড়ু ফুল সংগ্রহ করেন নারীরা। পাহাড়ের ভেতরে দিনের পর দিন ঘুরে এই ফুল সংগ্রহ করা সহজ কাজ নয়। তবু সংসারের প্রয়োজনেই এই কষ্ট সয়ে নেন তারা। সংগ্রহ করা ঝাড়ু ফুল সাধারণত হোন্ডাযোগে বাজারে আনা হয়।
মাটিরাঙ্গা হাটে ঢাকাসহ চট্টগ্রাম থেকে আসা পাইকাররা এসব ফুল কিনে নেন। পরে চাঁদের গাড়িসহ বিভিন্ন পরিবহনে নির্দিষ্ট স্থানে নিয়ে গিয়ে রোদে শুকানো হয়। শুকানোর পর ঝাড়ু বেঁধে তা দেশের বিভিন্ন বাজারে বিক্রি করা হয়।
একটি বান্ডিলে সাধারণত ৫০ থেকে ১০০টি আটি থাকে। মানভেদে প্রতিটি বান্ডিলের দাম ১২শত টাকা থেকে ২ হাজার টাকা পর্যন্ত হয়ে থাকে। পাইকারি ও খুচরা বাজারে হাত বদলের সঙ্গে সঙ্গে ঝাড়ু ফুলের এই স্টিকের দাম বেড়ে কখনো কখনো ১০০ টাকা পর্যন্ত পৌঁছে যায়।

পাহাড়ি নারীরা জানান, এটি তাদের মৌসুমি পেশা হলেও সংসার চালানোর অন্যতম ভরসা। এই আয়ের টাকা দিয়েই চাল, ডাল, লবণ থেকে শুরু করে সন্তানদের পড়াশোনার খরচ মেটানো হয়। তবে দুর্গম পাহাড়ে গিয়ে ফুল সংগ্রহ করতে গিয়ে বন্যপ্রাণীর ভয়, দুর্ঘটনা ও শারীরিক ঝুঁকির মুখে পড়তে হয়।
ঝাড়ু ফুল সংগ্রহ করতে আসা কালা পাহাড় এলাকার পাহাড়ি নারী রুনা ত্রিপুরা বলেন,“ভোরের আলো ফোটার আগেই আমরা ঘর থেকে বের হয়ে পড়ি। পাহাড়ের ভেতরে ঢুকে দুপুর গড়িয়ে যায়, তবুও কাজ থামে না। কখনো মাঘের তীব্র শিত, কখনো ঝাঁঝালো রোদ, কোনো কিছুই আমাদের থামাতে পারে না। পাহাড়ের আঁকাবাঁকা পথ পেরিয়ে ঝাড়ু ফুল সংগ্রহ করতে হয়। এই কাজটি খুবই কষ্টের, তবুও সংসারের তাগিদে করতে হয়। আমরা যে ঝাড়ু ফুল সংগ্রহ করি, তা বিক্রি করেই চাল, ডাল, লবণ কিনি। এই আয়ের ওপরই আমাদের পরিবার টিকে আছে।”
একই এলাকার আরেক পাহাড়ি নারী ডলি মারমা জানান, “আমাদের এলাকায় কাজের সুযোগ খুবই সীমিত। সারা বছর নিয়মিত কোনো কাজ পাওয়া যায় না। তাই ঝাড়ু ফুল সংগ্রহই আমাদের প্রধান ভরসা। এই ফুল না তুললে সংসার চালানোই কঠিন হয়ে পড়ে। পাহাড়ে গিয়ে কাজ করতে কষ্ট অনেক, শরীর ভেঙে আসে, তবুও নিজের পরিশ্রমে কিছু টাকা হাতে আসে এই অনুভূতিটাই আমাদের শক্তি দেয়। এই আয় দিয়েই পরিবারের নিত্যপ্রয়োজন মেটাই এবং সন্তানদের ভবিষ্যতের কথা ভাবি।”
আরেক পাহাড়ি নারী সুমি চাকমা বলেন,“আমরা নারী হয়েও প্রতিদিন পাহাড়ে যাই, ভারী বোঝা কাঁধে নিয়ে দুর্গম পথ পেরোই। এই কাজ সহজ নয়, কিন্তু সংসারের দায় আমাদের থামতে দেয় না। ঝাড়ু ফুল বিক্রি করে যে সামান্য আয় হয়, তা দিয়েই ছেলেমেয়েদের স্কুলের বেতন, খাতা-কলম আর নিত্য প্রয়োজনীয় খরচ চালাই। নিজের কষ্টে সন্তানদের পড়াশোনা করাতে পারছি এটাই আমাদের সবচেয়ে বড় সান্ত্বনা। তবে সরকার যদি একটু সহযোগিতা করত, যেমন সহজ পরিবহন, ন্যায্যমূল্য বা প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করত, তাহলে আমাদের জীবন অনেকটাই সহজ হতো।”
মাটিরাঙ্গা উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা মো. সেলিম রানা বলেন,“ঝাড়ু ফুল পাহাড়ি অঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সম্পদ। এটি চাষাবাদের আওতায় আনা গেলে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর আয় আরও বাড়বে। পাশাপাশি পরিকল্পিতভাবে সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করা গেলে পরিবেশের ক্ষতি না করেই এই সম্পদ থেকে দীর্ঘমেয়াদি সুফল পাওয়া সম্ভব।
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, সরকারি সহযোগিতা, সহজ পরিবহন ব্যবস্থা এবং ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা গেলে ঝাড়ু ফুল পাহাড়ি অর্থনীতিতে আরও বড় ভূমিকা রাখতে পারবে। সুতরাং, কালা পাহাড়ের ঝাড়ু ফুল তাই শুধু একটি পণ্য নয় এটি পাহাড়ি নারীদের শ্রম, সাহস আর জীবনের গল্প।


