নাইক্ষ্যংছড়ি সদর ইউপির টোল ইজারা নিয়ে বিতর্ক : স্থগিত হলো নিলাম

বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি সদর ইউনিয়ন পরিষদের টোল আদায় পয়েন্টের ইজারা কার্যক্রমকে কেন্দ্র করে ব্যাপক অনিয়ম, দুর্নীতি ও সিন্ডিকেট বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে।

অভিযোগের মুখে ইজারা কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত করা হলেও পুরো প্রক্রিয়া নিয়ে স্থানীয় ব্যবসায়ী ও দরদাতাদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ বিরাজ করছে। এ ঘটনায় ইউনিয়ন পরিষদের বর্তমান প্রশাসক ও উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা মাহবুব এলাহীর বিরুদ্ধে স্বজনপ্রীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং সরকারের বিপুল পরিমাণ রাজস্ব ক্ষতির অভিযোগ তুলেছেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা।

জানা গেছে, গত ১২ মে নাইক্ষ্যংছড়ি সদর ইউনিয়ন পরিষদের আওতাধীন টোল আদায় পয়েন্ট ইজারার জন্য উন্মুক্ত দরপত্র আহ্বান করা হয়। এতে প্রায় ১৪০ জন ব্যবসায়ী অংশগ্রহণ করেন। দরপত্র ফরম বিক্রির মাধ্যমে ইউনিয়ন পরিষদ প্রায় দেড় লাখ টাকা রাজস্ব আয় করে।

ভুক্তভোগী দরদাতা সৈয়দ আকাশ অভিযোগ করে বলেন, নিলাম কার্যক্রমে সর্বোচ্চ দর ওঠে ১ কোটি ২০ লাখ টাকা এবং দ্বিতীয় সর্বোচ্চ দর ছিল ৪১ লাখ ১০ হাজার টাকা। সর্বোচ্চ দরদাতা পরে ইজারা নিতে অপারগতা প্রকাশ করলে প্রচলিত বিধি অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণের সুযোগ ছিল। কিন্তু রহস্যজনক কারণে সেই প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি।

তিনি আরও বলেন, আমি ৮০ লাখ টাকায় ইজারা নিতে সম্মতি জানিয়েছিলাম। কিন্তু আমার প্রস্তাব বিবেচনায় না নিয়ে খাস কালেকশনের নামে ভিন্ন সিদ্ধান্ত নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। এতে সরকারের রাজস্ব আয় মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, সর্বোচ্চ দর উপেক্ষা করে একটি বিশেষ সিন্ডিকেটকে সুবিধা দিতে মাত্র ৬২ লাখ টাকায় ইজারা কার্যক্রম চূড়ান্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। এতে সরকার সম্ভাব্য প্রায় ৫৮ লাখ টাকার রাজস্ব আয় থেকে বঞ্চিত হতে পারে বলে দাবি ব্যবসায়ীদের।

NewsDetails_03

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন দরদাতা অভিযোগ করেন, সরকারি নিয়ম মেনে প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রে অংশ নেওয়ার পরও শেষ পর্যন্ত পুরো নিলাম প্রক্রিয়াকে প্রহসনে পরিণত করা হয়েছে। তাদের ভাষ্য, সর্বোচ্চ দর বিবেচনায় না নিয়ে গোপনে অন্যত্র ইজারা দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে, যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

তাদের দাবি, শতাধিক অংশগ্রহণকারীকে উৎসাহিত করে বিপুলসংখ্যক দরপত্র ফরম বিক্রি করা হলেও পরে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেটকে সুবিধা দিতে নিয়মবহির্ভূতভাবে কম মূল্যে ইজারা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়। এ ঘটনায় স্থানীয় ব্যবসায়ী মহল ও সচেতন নাগরিকদের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।

স্থানীয় ব্যবসায়ী ও ইউনিয়নবাসীরা বিতর্কিত ইজারা কার্যক্রম বাতিল করে সম্পূর্ণ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার মাধ্যমে পুনরায় উন্মুক্ত নিলাম আহ্বানের দাবি জানিয়েছেন। পাশাপাশি অভিযোগের বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণেরও দাবি জানান তারা।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে নাইক্ষ্যংছড়ি সদর ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসক ও উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা মাহবুব এলাহী বলেন, টোল আদায় পয়েন্টের ইজারা কার্যক্রম নিয়ে বিভিন্ন মহলে বিতর্ক ও অভিযোগ ওঠায় বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ইজারা কার্যক্রম আপাতত আগামী ৩০ জুন পর্যন্ত স্থগিত রাখা হয়েছে। খুব শিগগিরই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) সঙ্গে আলোচনা করে পরবর্তী করণীয় নির্ধারণ করা হবে। আলোচনার ভিত্তিতে যে সিদ্ধান্ত গৃহীত হবে, সে অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তবে দুর্নীতি, সিন্ডিকেট বাণিজ্য, স্বজনপ্রীতি কিংবা সম্ভাব্য রাজস্ব ক্ষতির অভিযোগের বিষয়ে তিনি বিস্তারিত কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

এদিকে টেন্ডার স্থগিতের ঘোষণার পরও পুরো ইজারা প্রক্রিয়া নিয়ে নানা প্রশ্ন রয়ে গেছে। স্থানীয়দের মতে, পুনরায় টেন্ডার আহ্বানের আগে পূর্ববর্তী নিলাম প্রক্রিয়ায় কেন সর্বোচ্চ দর উপেক্ষা করা হয়েছিল এবং কার স্বার্থে কম মূল্যে ইজারা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল—সেসব বিষয় নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে জনসমক্ষে তুলে ধরা প্রয়োজন।

সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী, ইউনিয়নবাসী ও সাধারণ জনগণের দাবি, অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন করে দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা হোক এবং ভবিষ্যতে সরকারি রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের অনিয়মের সুযোগ না থাকে তা নিশ্চিত করা হোক।

আরও পড়ুন