স্বাধীনতা ৫৫ বছরের চিকিৎসা সেবা বঞ্চিত হচ্ছে সীমান্তবাসী

বান্দরবানের থানচি উপজেলার দুর্গম রেমাক্রী ইউনিয়নের মায়ানমার সীমান্তবর্তী বড় মদক ও আশপাশের প্রায় ৬০টি গ্রামের মানুষের কাছে চিকিৎসাসেবা এখনো অনেকটাই দূরের বিষয় স্বাধীনতা ৫৫ বছরে ও পৌছাইনি। প্রতিবছর এসব এলাকায় ম্যালেরিয়া, ডায়রিয়া, টাইফয়েড, হামসহ নানা রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিলেও নেই কোনো স্থায়ী হাসপাতাল বা স্বাস্থ্যকেন্দ্র।

অসুস্থ হলে প্রায় ৭০ কিলোমিটার দুর্গম পাহাড়ি ও নৌপথ পাড়ি দিয়ে থানচি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যেতে হয় রোগীদের। এতে জরুরি রোগীদের সময়মতো চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হয় না। অনেক ক্ষেত্রে চিকিৎসা নিতে দেরি হওয়ায় রোগীর অবস্থার অবনতি ঘটে; ঘটছে মৃত্যুর ঘটনাও।

বড় মদক, ছোট মদক, সাঙ্গু রিজার্ভ, তিন্দু ইউনিয়নের কিছু অংশ, আন্ধারমানিকসহ আশপাশের দুর্গম এলাকায় ১০ হাজারের বেশি মানুষের বসবাস।

স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য মতে গত ২০২০ হতে ২০২৬ সালের মধ্যে রেমাক্রী ও তিন্দু ইউনিয়নের ম্যালেরিয়া, ডায়রিয়া, টাইফয়েড, হামসহ নানা রোগের আক্রান্ত হয়ে শতাধিক রোগী চিকিৎসা কেন্দ্রে পৌছতে না পারায় নদীর পথে শতাধিক রোগী মারা গেচ্ছে।

সীমান্তঘেঁষা এসব জনপদে নিয়মিত চিকিৎসাসেবা না থাকায় সাধারণ রোগও অনেক সময় জটিল আকার ধারণ করে। বিশেষ করে শিশু, নারী ও বয়স্ক রোগীদের নিয়ে স্বজনদের দুর্ভোগ সবচেয়ে বেশি।

পান ঝিড়ি পাড়া বাসিন্দা বুলু ম্রো বলেন, প্রতিবছর বর্ষা ও বর্ষা-পরবর্তী সময়ে এসব এলাকায় পানিবাহিত রোগের প্রকোপ বাড়ে। ডায়রিয়া, টাইফয়েডসহ নানা রোগে আক্রান্ত হন বিভিন্ন বয়সী মানুষ। শিশুদের মধ্যেও হামসহ সংক্রামক রোগ ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু কাছাকাছি কোনো স্বাস্থ্যকেন্দ্র না থাকায় অসুস্থ মানুষকে দুর্গম পাহাড়ি পথ ও নদীপথ পাড়ি দিয়ে উপজেলা সদরে যেতে হয়।

NewsDetails_03

দুর্গম যোগাযোগব্যবস্থার কারণে গুরুতর অসুস্থ রোগীদের দ্রুত হাসপাতালে নেওয়াও সম্ভব হয় না। বড় মদক থেকে থানচি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পৌঁছাতে পাহাড়ি পথের পাশাপাশি নৌপথও ব্যবহার করতে হয়। বর্ষাকালে নদীপথের ঝুঁকি এবং পাহাড়ি সড়কের দুরবস্থা এ দুর্ভোগ আরও বাড়িয়ে দেয়।

রেমাক্রী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মুইশৈথুই মারমা (রনি) বলেন, বড় মদক ও আশপাশের এলাকায় প্রতিবছর পানিবাহিত রোগসহ বিভিন্ন রোগের প্রকোপ দেখা দেয়। পর্যাপ্ত চিকিৎসাসেবা না থাকায় জরুরি চিকিৎসার অভাবে মৃত্যুর ঘটনাও ঘটছে। বড় মদকে একটি হাসপাতাল স্থাপন করা এখন জরুরি। সরকারি উদ্যোগে হাসপাতালটি হলে বড় মদক, ছোট মদকসহ সীমান্তবর্তী এলাকার মানুষ প্রয়োজনীয় ও জরুরি চিকিৎসাসেবা পাবেন।

বড় মদক গ্রামে বাসিন্দা মংমে মারমা, জাপরাং পাড়া বাসিন্দা অলসেন ত্রিপুরা জানান, রেমাক্রী ইউনিয়নের দুর্গম ও গুরুত্বপূর্ণ মধ্যবর্তী এলাকা বড় মদক। এখানে একটি হাসপাতাল স্থাপন করা হলে বুলুপাড়া, আন্ধারমানিক, ছোট মদক, বড় মদকসহ তিন্দু ইউনিয়নের আশপাশের দুর্গম এলাকার মানুষও দ্রুত চিকিৎসাসেবা পাবেন। এ কারণে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, হেডম্যান, পাড়াপ্রধান ও শিক্ষিত তরুণরা বড় মদকে একটি হাসপাতাল স্থাপনের দাবি জানিয়েছেন।

থানচি উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. ওয়াহিদুজ্জামান মুরাদ বলেন, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, হেডম্যান, পাড়াপ্রধান ও শিক্ষিত তরুণদের পক্ষ থেকে বড় মদকে হাসপাতাল স্থাপনের আবেদন করা হয়েছে। তাদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে দ্রুত প্রস্তাব পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

মদক বাজারের বাসিন্দা চসিংমং মারমা বলেন, স্বাস্থ্যসেবা মানুষের মৌলিক অধিকার হলেও সীমান্তবর্তী বড় মদকের মানুষের জন্য সেই অধিকার এখনো দুর্গম পথের ওপারে। অস্থায়ী চিকিৎসা কার্যক্রম দিয়ে দীর্ঘদিনের এই সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয় বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

তাদের দাবি, বড় মদকে সরকারি উদ্যোগে একটি স্থায়ী হাসপাতাল স্থাপনের পাশাপাশি চিকিৎসক, ওষুধ ও জরুরি চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে হবে।

বিএনপি সাধারণ সম্পাদক উবামং মারমা প্রশ্ন ছুড়ে বলেন, আর কতদিন চিকিৎসার জন্য ৭০ কিলোমিটার দুর্গম পথ পাড়ি দিতে হবে? আর কত প্রাণ ঝুঁকিতে পড়লে বড় মদকে পৌঁছাবে স্থায়ী স্বাস্থ্যসেবা? সীমান্তবর্তী এই জনপদের মানুষের জীবন ও স্বাস্থ্য সুরক্ষায় বড় মদকে একটি সরকারি হাসপাতাল স্থাপন এখন সময়ের দাবি।

আরও পড়ুন