খাবারের তালিকায় বাঁশ কোঁড়ল : হ্রাস পাচ্ছে পাহাড়ের বাঁশ সম্পদ

মূলত বাঁশের গোঁড়ার কচি নরম অংশকে বলা হয় বাঁশ কোঁড়ল। পাহাড়ের আদিবাসী সম্প্রদায়ের খাদ্য তালিকার মধ্যে অন্যতম সবজি হিসেবে রয়েছে এ বাঁশ কোঁড়ল। বর্ষা মৌসুম শুরু হলেই পাহাড়ে জন্ম নেয় নতুন নতুন বাঁশ কোঁড়ল। এসব বাঁশে পরিণত হওয়ার আগেই প্রতিদিন বাজারে বিক্রি হয়। বাঙালিরাও এখন বাঁশ কোঁড়ল খেতে শুরু করায় এখন দিন দিন বাঁশ উৎপাদন হ্রাস পাচ্ছে।

জানা গেছে, পাহাড়ে কয়েক প্রজাতির বাঁশ জন্মে। এর মধ্যে রয়েছে মুলি, দুলু, মিটিঙ্গা, কালি ও ছোটিয়া। এর মধ্যে মুলিবাঁশ বেশি জন্মায়। বর্ষা মৌসুম শুরু হলেই আস্তে আস্তে বাঁশ বাগানগুলোতে জন্ম নিতে শুরু করে বাঁশ কোঁড়ল। জুন, জুলাই ও আগস্ট এই তিন মাস বাঁশের বংশ বৃদ্ধির মৌসুম। এটি সবজি হিসেবে খেতে খুবই সুস্বাদু বিধায় বর্তমানে আদিবাসীদের পাশাপাশি পাহাড়ের বাঙালিরাও বাঁশ কোঁড়ল খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলেছেন।

তিন পার্বত্য জেলার সকল উপজেলার বিভিন্ন হাট বাজারে এখন বাঁশ কোঁড়ল বিক্রি করা হয় সচরাচর। মঙ্গলবার লামা সদর ইউনিয়নের মেরাখোলা থেকে উচিনু মার্মা (৩২) সপ্তাহে ৩-৪ দিন বিক্রির জন্য লামা বাজারে ১৫০-২০০টি হারে বাঁশ কোঁড়ল নিয়ে আসেন। প্রতি কেজি বিক্রি করা হয় ৬০ টাকা।

গজালিয়া ইউনিয়নের উওয়াংচিং মার্মানিও বাজারে প্রায় প্রতিদিন একই পরিমাণ বাঁশ কোঁড়ল বিক্রি করতে আসেন সংসার চালানোর তাগিদে। তাদের মতো আরও অনেকে সাপ্তাহিক দু’দিন হাট-বাজার ছাড়া প্রায় প্রতিদিন সকালে অথবা বিকেলে বাঁশ কোঁড়ল বিক্রি করতে নিয়ে আসেন।

বেসরকারি এক জরিপ মতে,পার্বত্য বান্দরবান, রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়ি জেলায় আদিবাসী জনসংখ্যা প্রায় দেড় লাখ। প্রতি পরিবারে পাঁচজন সদস্য ধরলে পরিবারের সংখ্যা ৪০ হাজার। প্রতিটি পরিবার সপ্তাহে একবেলা খাবারের সময় ১১টি বাঁশ কোঁড়ল খেলে এক মাসে এক একটি পরিবার ৪৪টি বাঁশ কোঁড়ল খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে। সে হিসেবে তিন মাস বাঁশ জন্মানোর মৌসুমে ৪০ হাজার পরিবার অর্ধকোটির বেশি বাঁশ কোঁড়ল খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করা হচ্ছে।

জানা যায়, তাজা বাঁশের কোঁড়লে শতকরা ৮৮-৯৩ভাগ পানি, ১.৫-৪ ভাগ প্রোটিন, ০.২৫-০.৯৫ ভাগ চর্বি, ০.৭৮-৮৬ ভাগ চিনি, ০.৬০-১.৩৪ ভাগ সেলুলৈাজ এবং ১.১ ভাগ খনিজ পদার্থ আছে। এছাড়া ভিটামিনও রয়েছে প্রচুর।

বিভিন্ন গবেষণা থেকে জানা গেছে, বাঁশের কোঁড়ল দেহে কোলেস্টেরলের মাত্রা কমিয়ে হৃদরোগের ঝুঁকি কমায়, উচ্চ রক্তচাপ কমায় ও ক্যান্সারের ঝুঁকিও কমায়। কোষ্ঠ কাঠিন্য, হাঁপানী, ডায়বেটিস, তীব্র জ্বর, মৃগি রোগে মূর্ছা যাওয়া ইত্যাদি নিরাময়েও যথেষ্ট অবদান রাখে। ফলে খাদ্য তালিকায় চাহিদা বাড়ার কারনে হ্রাস পাচ্ছে বাঁশ সম্পদ।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গত চার বছর আগে পার্বত্য জেলায় বাঁশে ফুল আসে ও মড়ক সৃষ্টি হয়। পাশাপাশি ইঁদুর বন্যা দেখা দেয়। ফলে একদিকে বাঁশ বাগানে মড়ক অন্যদিকে ইঁদুরও বাঁশ বাগান নষ্ট করে ফেলে। এতে বাঁশের উৎপাদন কমে যায়। রাতারাতি বাঁশের দাম বেড়ে গিয়ে প্রতি হাজার ১৮-২০ হাজার টাকা এসে দাঁড়ায়। প্রাকৃতিকভাবে বাঁশে মড়ক লাগার দু’বছরের মধ্যে আবার বাঁশের উৎপাদন শুরু হয়। গত বছর প্রতি হাজার মুলি বাঁশের দাম ছিল ১০-১১ হাজার টাকা। এরপরও অনেক পাহাড়ি পরিবার ঘর মেরামত ও নতুন ঘর তৈরি করতে অসুবিধার সম্মুখীন হয়েছে বলে জানিয়েছেন, উপজেলার রূপসীপাড়া ইউনিয়নের হ্লাচাই পাড়া কারবারী ধুংচিং অং মারমা, গজালিয়া ইউনিয়নের মংক্যচিং মার্মাসহ আরো অনেকে।

এ বিষয়ে লামা বিভাগীয় বন কর্মকর্ত কামাল উদ্দিন আহমেদ জানান, জুন, জুলাই ও আগস্ট মাস হচ্ছে বাঁশ জন্মানোর মৌসুম। এ সময় বাঁশ কোঁড়ল সংগ্রহের ফলে বাঁশ উৎপাদন কমে যাওয়া স্বাভাবিক। তবে বন বিভাগের রিজার্ভ এলাকা থেকে কাউকে বাঁশ কোড়ল সংগ্রহ করতে দেয়া হয়না।

গত কয়েক বছরে পাহাড়ি উপজেলায় প্রায় কোটিরও বেশি বাঁশ অংকুরেই ঝরে পড়েছে বলে অভিজ্ঞমহলের ধারণা। এ বাঁশ কোঁড়ল নিধন অব্যাহত থাকলে আগামি কয়েক বছরের মধ্যেই এতদ্বঞ্চল থেকে বাঁশ সম্পদ একেবারেই হারিয়ে যাবে।

আরও পড়ুন

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না।