ঝুঁকি নয়, উঁচু জমিতে কচুর চড়া চাষে সাফল্য

পাহাড়ি জমিতে সম্ভবনার নতুন দিগন্ত

উঁচু পাহাড়ি জমিতে কৃষি কাজ দীর্ঘদিন ধরে নানা চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়েই পরিচালিত হয়ে আসছে। মাটি ক্ষয়, সেচ সুবিধার অভাব, অতিবৃষ্টি ও খরার প্রভাব এসব কারণে পাহাড়ে অনেক ফসলই চাষ উপযোগী নয়। তবে এসব বাধা উপেক্ষা করে মাটিরাঙ্গার কৃষকেরা এখন নতুন ভরসার ফসল হিসেবে বেছে নিচ্ছেন কচুর চড়া। কম খরচে ভালো লাভ হওয়ায় দিন দিন কচুর চাষের প্রতি ঝুঁকছেন এখানকার কৃষকেরা।

পাহাড়ি উঁচু জমিতে পানি জমে না, ফলে কচু জাতীয় ফসলের জন্য এটি আদর্শ স্থান। কচুর চড়ায় রোগবালাই কম, সহজে বিক্রি করা যায় এবং বাজারে সারা বছর চাহিদা থাকায় এই ফসল কৃষকদের আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী করে তুলছে।

পাহাড়ি উঁচু জমিতে কচুর চড়ার সাফল্য এখন শুধু একজন কৃষকের নয়, বরং এটি হয়ে উঠছে একটি সম্প্রদায়ের পরিবর্তনের গল্প। এই গল্পে আছে সংগ্রাম, আছে সম্ভাবনা, আর আছে আত্মবিশ্বাসের এক নতুন সূচনা।

মাটিরাঙ্গার কৃষি বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, জলবায়ু পরিবর্তন ও বৈশ্বিক খাদ্য নিরাপত্তার এই সময়ে পাহাড়ি কৃষিকে টেকসই করতে হলে স্থানীয়ভাবে উপযোগী এমন ফসলের চাষ বাড়াতে হবে। কচুর চড়া চাষে সরকারের নীতি সহায়তা, প্রশিক্ষণ এবং আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয় ঘটাতে পারলে পাহাড়ের কৃষিতে আসবে বিপ্লব।

মাটিরাঙ্গা উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, ২০২২-২৩ অর্থ বছরে উপজেলার ২১০ হেক্টর জমিতে কচুর ছড়ার আবাদ করা হয়। ২০২৩-২৪ অর্থ বছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ২৩৬ হেক্টরে। আর চলতি ২০২৪-২৫ অর্থ বছরে আবাদ হয়েছে ২৬৫ হেক্টর জমিতে, যা আগের দুই বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। চলতি বছরের লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী, এই জমি থেকে ৬,৪৬০ মেট্রিকটন কচু উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে বলে আশা করা হচ্ছে।

NewsDetails_03

মাটিরাঙ্গার স্থানীয় বাজারে কচুর ছড়ার কেজি প্রতি ৫০ টাকা বিক্রি করা হচ্ছে। আর কদিন বাদের পুরোদমে কচুর ছড়া বাজারে উঠে গেলে দাম কিছুটা কমে যেতে পারে। মাটিরাঙ্গা উপজেলার রাসুল পুর, বাইল্যাছড়ি, আটবাড়ি, ১০নং, ব্যঙ মারা, খেদাছড়া, গোমতী, আমতলী ইউনিয়নের দেওয়ান পাড়া, বড়নালের মাষ্টার পাড়া, ভুট্টো পাড়া, তবলছড়ির বিশাল এলাকাজুড়ে তাইন্দং এর বিভিন্ন স্থানে কচুর ছড়ার চাষ হয়।

সরেজমিনে কচু ক্ষেত গুরে দেখা যায়, মাটিরাঙ্গার ব্যঙ মারায় খাগড়াছড়ি –চট্টগ্রাম -ঢাকা সড়কের পাশেই একটি বিস্তীর্ণ টিলা ভূমি সমতল পৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৫শত মিটার উঁচুতে টিলা ভূমি টি ঢালু হবার দরুন সেখানে বিশাল জায়গাজুড়ে কচুর ক্ষেত। দৃষ্টিনন্দন ক্ষেত টি দেখতে প্রতিদিন স্থানীয়রা এখানে এসে চোখ জুড়ান, যে কোন পর্যটকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বিধায় পর্যটকরা বাইক রেখে কচু ক্ষেতের পাহাড়ের দৃশ্য দেখে ছবি তুলে নেন।

এদিকে, বড়নাল ইউনিয়নের মাষ্টার পাড়ার কৃষক জাকির হোসেন ২০ একর জমিতে কচুর আবাদ করেন। কচুর অবস্থা বেশ ভাল যদি এবার ভাল দাম পান তাহলে তিনি খুব লাভবান হবেন বলে জানান।
রসুলপুরের কৃষক আমির হোসেন জানান, “আগে তেমন লাভজনক কিছু চাষ করতে পারতাম না। কিন্তু কচুর চড়া চাষে কম খরচে ভালো ফলন পাওয়ায় এখন পরিবার-পরিজন নিয়ে ভালো আছি। জমি উঁচু হওয়ায় পানি জমে না, আবার খুব একটা সার-কীটনাশকও দিতে হয় না।”

একই অভিমত দিলেন কৃষক আকবর হোসেন তিনি বলেন, “আমি ১০ একর জমিতে কচুর চড়া চাষ করি। এবার আবহাওয়া অনুকূল থাকার কারণে ভাল ফলন আশা করছি।

মাটিরাঙ্গা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. সবুজ আলী জানান, “পাহাড়ি অঞ্চলের কৃষির সম্ভাবনা কাজে লাগাতে হলে আমাদের স্থানীয় ফসল ও জমির প্রকৃতি বুঝে ফসল নির্বাচন করতে হবে। কচুর ছড়া সে দিক থেকে একটি উপযুক্ত ফসল। আমরা নিয়মিত কৃষকদের পরামর্শ, প্রশিক্ষণ, এবং প্রযুক্তিগত সহায়তাও দিচ্ছি যাতে উৎপাদন আরও বাড়ানো যায়।”

তিনি আরও বলেন, “সঠিক পরিচর্যা, রোগবালাই ব্যবস্থাপনা এবং বাজার সংযোগ নিশ্চিত করা গেলে কচুর ছড়া হতে পারে এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক উন্নয়নের বড় মাধ্যম।”

আরও পড়ুন