যোগদানের আড়াই মাসেও দায়িত্ব পায়নি নির্বাহী প্রকৌশলী, নাটের গুরু এরশাদুল হক !
রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদ
চলতি বছরের ১৬ এপ্রিল রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের নির্বাহী প্রকৌশলীর শূন্য পদে পদায়ন করে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)। এরপর গত ৫ মে যোগদান করলেও বিগত আড়াই মাসেও দায়িত্ব বুঝে পাননি নির্বাহী প্রকৌশলী। অন্যদিকে, নির্বাহী প্রকৌশলীর পদটি শূন্য থাকায় দীর্ঘ এক বছরের বেশি সময় ধরে ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী প্রকৌশলীর দায়িত্ব পালন করছেন ডিপ্লোমা ইন ইঞ্জিনিয়ার সম-মর্যাদার একজন সহকারী প্রকৌশলী, ফলে বিষয়টি নিয়ে রাঙামাটিতে ব্যাপক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছ। শূন্য পদে নির্বাহী প্রকৌশলী পদায়নের পরও দায়িত্ব বুঝে দেওয়ার ঘটনায় উঠছে নানান প্রশ্নও, অনেকে এই ঘটনার জন্য প্রতিষ্ঠানটির ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী প্রকৌশলী এরশাদুল হক মন্ডলকে নেপথ্য নায়ক হিসাবে দায়ি করছে।
সংশ্লিষ্ট দপ্তর সূত্রে জানা গিয়েছে, ২০২৪ সালের ১০ নভেম্বর চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর ২০২৫ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান কাজল তালুকদার সাক্ষরিত এক অফিস আদেশে পরিষদের তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী বিরল বড়ুয়াকে অব্যাহতি দিয়ে পরিষদের সদ্য-পদোন্নতি পাওয়া সহকারী প্রকৌশলী আবু জাফর মো. এরশাদুল হক মন্ডলকে ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী প্রকৌশলীর দায়িত্ব দেয়া হয়। পরবর্তীতে এ ঘটনার এক বছর পর চলতি বছরের ২৫ মার্চ আরেক অফিস আদেশে ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী প্রকৌশলী আবু জাফর মো. এরশাদুল হক মন্ডলের অনুপস্থিতিতে সহকারী প্রকৌশলী উজ্জ্বল কান্তি দেওয়ানকেও ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী প্রকৌশলীর দায়িত্ব দেন চেয়ারম্যান কাজল তালুকদার।
উল্লেখ্য যে, ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী প্রকৌশলীর দায়িত্ব পাওয়া আবু জাফর মো. এরশাদুল হক মন্ডল ও উজ্জ্বল কান্তি দেওয়ান ২০২৪ সালের ১ ডিসেম্বর উপ-সহকারী প্রকৌশলী পদ থেকে পদোন্নতি পেয়ে সহকারী প্রকৌশলী হন। উপ-সহকারী প্রকৌশলী থেকে পদোন্নতি পাওয়ার ২ মাস পরই ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী প্রকৌশলী হন এরশাদুল হক মন্ডল।
এদিকে, রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের প্রকৌশল বিভাগের নির্বাহীর পদটি ১ বছর ২ মাসের বেশি সময় শূন্য থাকার পর চলতি বছরের ১৬ এপ্রিল বান্দরবান জেলার রোয়াংছড়ি উপজেলা প্রকৌশলী দিবাকর রায়কে পদোন্নতি দিয়ে নির্বাহী প্রকৌশলীর চলতি দায়িত্বে পদায়ন করে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর এলজিইডি)। এরপর ২৩ এপ্রিল ছাড়পত্র পান নতুন নির্বাহী প্রকৌশলী দিবাকর রায়। পরবর্তীতে গত ৫ মার্চ তিনি যোগদানপত্র জমা দেন। কিন্তু বিগত আড়াই মাস সময়েও যোগদানপত্র গ্রহণ করে তাকে দায়িত্ব দেয়া হয়নি।
সবশেষ গত ২০ জুলাই জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান কাজল তালুকদার এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী বরাবর লেখা এক চিঠিতে উল্লেখ করেন যে, পরিষদের উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন, তদারকি ও কারিগরি ব্যবস্থাপনার লক্ষ্যে জনবল কাঠামোয় একজন নির্বাহী প্রকৌশলী, ২ জন সহকারী প্রকৌশলী এবং উপসহকারী প্রকৌশলীদের সমন্বয়ে একটি প্রকৌশল বিভাগ বিদ্যমান। উক্ত পদসমূহে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর কর্মকর্তাদের প্রেষণে পদায়ণের মাধ্যমে কার্যক্রম পরিচালিত হয়ে থাকে। প্রচলিত প্রশাসনিক রেওয়াজ অনুযায়ী জেলা পরিষদে প্রেষণে কর্মকর্তা পদায়নের পূর্বে প্রতিষ্ঠান প্রধানের সঙ্গে আলোচনা ও সমন্বয়ক্রমে এসকল পদে পদায়নের বিষয়টি সম্পন্ন করা হয়ে থাকে। কিন্তু দিবাকর রায়কে নির্বাহী প্রকৌশলীকে উক্ত রেওয়াজ অনুসরণ করে জেলা পরিষদে প্রেষণে পদায়ন করা হয়। পরবর্তীতে তিনি ৩ মে পরিষদে যোগদানপত্র দাখিল করেন।
চিঠিতে চেয়ারম্যান আরও লিখেন, বর্তমানে রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদে প্রেষণে নির্বাহী প্রকৌশলী পদে কর্মকর্তা পদায়নের প্রয়োজনীয়তা নেই। ফলে তার দাখিলকৃত যোগদানপত্র গ্রহণ করা সম্ভব হচ্ছে না ভবিষ্যতে প্রয়োজন দেখা দিলে যথারীতি চাহিদাপত্র প্রেরণ করা হবে।

নির্বাহী প্রকৌশলীর (চলতি দায়িত্ব) দায়িত্বে পদায়ন পাওয়া দিবাকর রায় বলেন, আমি গত ৫ মে যোগদান করি। জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা মহোদয় বলেন, জুনে আমাদের পেন্ডিং কাজ আছে,আপনি জুলাইতে দায়িত্ব নেন। এই বিষয়ে আমি তখনকার মন্ত্রী মহোদয়কে অবহিত করেছিলাম। উনিও জুলাইতে দায়িত্ব নেওয়ার কথা বলেছিলেন। পরবর্তীতে আমি জুলাই মাসে কয়েকধাপে যোগদান করতে এসেও যোগদান করতে পারিনি। ২১ জুলাই আমি যোগদান করে আসায় আমাকে একটা চিঠির অনুলিপি দেয়া হয়। পদায়নের তিন মাস নানা বাহানায় বিলম্ব করার পরও আমার যোগদানপত্র গ্রহণ করা হচ্ছে না। এদিকে একই কারণে আমার বেতন-ভাতা প্রাপ্তি নিয়েও সংকট দেখা দিয়েছে। তিনি আরও বলেন, ৫ম গ্রেডের শূন্য পদ থাকা সত্ত্বেও নিচের গ্রেডের লোক দিয়ে কাজ করার জন্য যোগদানপত্র গ্রহণ করা হচ্ছে না।
তবে এসব প্রসঙ্গে জানতে চাইলে রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান কৃষিবিদ কাজল তালুকদার বলেন, এটা প্রশাসনিক ব্যাপার, আমি কাউকে এগুলা বলব না। এটা পুরো জেলা পরিষদের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার।
জেলা পরিষদের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা খোন্দকার মোহাম্মদ রিজাউল করিম বলেন, কালকেই (মঙ্গলবার) উনার সঙ্গে আমার দেখা হয়েছে। যোগদানের বিষয়টি চেয়ারম্যান স্যারই গ্রহণ করেন, আমিও যোগদান করি চেয়ারম্যানের কাছেই। এখন উনার যোগদানপত্র গ্রহণ করছেন কি-না আমার কাছে কোনো তথ্য নেই। উনি আরও মাসখানেক আগে যোগদান করছেন এটা আমি জানি। যোগদানপত্র এন্ডোরস করলে চেয়ারম্যানই করে থাকেন।
তিনি আরও বলেন, যোগদানপত্র গ্রহণ করা, এন্ডোরস করা চেয়ারম্যান স্যারই করেন। অনেক সময় পরিষদে কোনো কর্মকর্তা যোগদান করতে হলে বা এখানে কাউকে পদায়ন/বদলি করলে পরিষদের একটা মতামত লাগে। যেমন এখান থেকে ৪৬ নার্স বদলি হয়েছেন পরিষদকে না বলেই এবং তারা আমাদের কোনো ছাড়পত্র ছাড়াই যোগ করেন। এখন বেতন পায় না। এখন আবার দুই-একজন করে আসে। সে কারণে পদায়ন/বদলির ক্ষেত্রে চেয়ারম্যানের মতামত নেয়া হয়; এখন সেক্ষেত্রে কোনো ব্যতয় হয়েছে কিনা এটা একটু জানতে হবে।
এদিকে, নির্বাহী প্রকৌশলীর পদটি এক বছরের বেশি শূন্য থাকার পরও সদ্য পদোন্নতি পাওয়া সহকারী প্রকৌশলীকে ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী প্রকৌশলীর পদে বহাল রাখাকে ‘দুরভিসন্ধিমূলক’ বলছেন বিশিষ্টজনরা।
অবসরপ্রাপ্ত একজন নির্বাহী প্রকৌশলী বলছেন, নির্বাহী প্রকৌশলীর পদটি এক বছরের বেশি সময় ধরে শূন্য থাকার পর শূন্যপদে কাউকে পদায়ন করা হলে যোগদান করতে না দেওয়া তো উচিত না। এতে করে বদলির আদেশপ্রাপ্ত কর্মকর্তা পূর্ববর্তী কর্মস্থল হতে অবমুক্ত হয়ে নতুন কর্মস্থলে যোগদান করতে না পারলে চাকুরিবিধি মোতাবেক বিভিন্ন জটিলতার উদ্ভব হতে পারে। প্রশাসনিক নানা জটিলতার কারণে এ ধরনের কার্যকলাপ কখনো কাম্য নয়। এছাড়া নির্বাহী প্রকৌশলী পদে একজন এবং আরও দুজন সহকারী প্রকৌশলী পদে বিএসসি ইঞ্জিনিয়ার ডিগ্রিধারী বা সমমর্যাদার প্রকৌশলী থাকার কথা থাকলেও সেখানে একজনও নেই। নির্বাহী প্রকৌশলীর পদটিও বছরের অধিক সময় শূন্য। এটি প্রশাসনিকভাবে কাজের ধীরগতির পাশাপাশি অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পেও স্বাভাবিকভাবে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। একজন প্রকৌশলীকে তিন মাস ধরে ঘোরাঘুরির পরও যোগদান করতে না দেওয়া অবশ্যই দুরভিসন্ধিমূলক।
জানতে চাইলে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) রাঙামাটি জেলা কমিটির সভাপতি অ্যাডভোকেট দীননাথ তঞ্চঙ্গ্যা বলেন, ভারপ্রাপ্ত দায়িত্ব দিয়ে চালানোর পর পুরোদমে একজন নির্বাহী নির্বাহীকে দায়িত্ব দেয়া নিঃসন্দেহে ভালো সংবাদ এবং এতে করে জেলা পরিষদের কাজে গতি বাড়বে। কিন্তু একজন নির্বাহী প্রকৌশলীকে পদায়ন করার পরও তাকে যোগদান করতে না দেয়া উচিত নয়। যদি না দেওয়ার কোনো কারণ থাকে তাকে তাহলে তাকে সেটি সুনির্দিষ্টভাবে জানিয়ে দেয়া উচিত।


