কে রাখবে লামার নারী মুক্তিযোদ্ধা জোহরা খাতুনের খবর ?

স্বাধীনতার ৪৮ বছরেও বান্দরবানের লামা উপজেলার নারী মুক্তিযোদ্ধা জোহরা খাতুনের খবর কেউ রাখেনি। নিজ পরিবারসহ যার অসীম ত্যাগের বিনিময়ে আজ একটি লাল সবুজের পতাকা, বিশ্বের বুকে একটি মানচিত্র পেয়েছি আমরা সেই বীর কন্যার খবর কেউ রাখেনি।

নারী মুক্তিযোদ্ধা জোহরা খাতুন বলেন, তখন আমার বয়স মাত্র ১৪ বছর। ১৯৭১ সালের মার্চ মাসের শেষ দিকে হঠাৎ পশ্চিম পাকিস্তানি মিলিটারি’র গুলির শব্দে কেঁপে উঠে চট্টগামের হাটহাজারির আকাশ-বাতাস। তখন চট্টগ্রামের বিহারী কলোনী ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ের জন্যে বড় ভাই মুক্তি বাহিনীর সদস্য মোহাম্মদ হোসেন হাটহাজারির একটি হাই স্কুল মাঠে মুক্তি বাহিনীর ক্যাম্পে আমার বাবা আবদুল আজিজ ও আমাকে রেখে মুক্তিযুদ্ধের ট্রেনিং নিতে ভারতে যান।

আমি ক্যাম্পে মুক্তি বাহিনীর রান্না করতাম, গুলিবিদ্ধ মুক্তি সেনাদের সেবাযত্ন করতাম। আমার বাবা বাহিরে ঘুরে ঘুরে পাকিস্তানি বাহিনীর গতিবিধির উপর নজর রাখতেন; আর মুক্তিবাহিনীকে তথ্য দিতেন। যখন যুদ্ধের ভয়াবহ রুপ ধারণ করলো, তখন নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে মুক্তি সেনাদের পাহারায় রাতভর পায়ে হেটে কালুর ঘাট ব্রীজের দক্ষিণ পাড়ে; ভোরের আলো ফুটতেই আবার আমরা গাড়ি যোগে লোহাগাড়া উপজেলার ফকিরহাঠ গ্রামে যাই, সেখান থেকে বাবাসহ বান্দরবানের লামা উপজেলার আজিজনগরের পূর্বচাম্বী আমতলী গ্রামে আশ্রয় নিই। ভারত থেকে অস্ত্র ট্রেনিং নিয়ে আমার বড় ভাই বীর মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ হোসেন ব্রাক্ষনবাড়িয়ায় স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশ নেন। বলছিলেন, নারী সহ-মুক্তিযোদ্ধা জোহরা খাতুন।

জোহরা খাতুনের যাবতীয় ডকুমেন্ট পর্যালোচনায় দেখা যায়, বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা পূনর্বাসন সোসাইটি কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিল ৬৭ বঙ্গবন্ধু এভিনিউ, ঢাকা কর্তৃক ইস্যুকৃত সনদ নং: খ/১২২৩১ ও একটি মুক্তিযোদ্ধা মহিলা কমান্ড পরিচয় পত্র- কার্ড নং- ৩২৪২৫ রয়েছে জোহরা খাতুনের কাছে। জাতীয় বীর আলহাজ্ব এম, এ, সামাদ সরকার (স্বাধীনতার সূর্য) প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিল এবং মুক্তিযোদ্ধা ছায়া প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক ০১ মার্চ/২০১০ সালে স্বাক্ষরিত সনদে উল্লেখ রয়েছে ‘মিসেস জোহরা খাতুন পূর্বচাম্বী আমতলীপাড়া, এমচর হাট, লামা, বান্দরবান এর একজন যুব কমান্ড সৈনিক।

তাহার পিতা ও ভাই বাংলাদেশের ‘৭১-এর স্বাধীনতা যুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশ গ্রহন করেছেন। মহান মুক্তিযুদ্ধে তাহার পরিবারের অবদান ছিল বিরল। মুক্তিযোদ্ধার উত্তরসূরী হিসাবে যুব কমান্ড রাষ্ট্রীয় সকল দাবীদার হিসাবে চিহ্নিত হবেন’। সনদটিতে আরো উল্লেখ রয়েছে যে, মহামন্য হাই কোর্টের রায়প্রাপ্ত, তারিখ- ২৬শে জুন-২০০০ ইং । গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত, রেজি: নং-(১ঠ-৪২)।

মুক্তিযোদ্ধা জোহরা খাতুন আরও জানান, ৭১’র রণাঙ্গনে মুক্তি বাহিনীকে সহযোগিতা করে ৪৮ বছরে কপালে একটি সনদ ছাড়া আর কিছুই জুটেনি। নারীর ক্ষমতায়ন কি ও নারীর উন্নয়নে সরকার কি কি কর্মসুচী বাস্তবায়ন করছে, এসবের কিছুই জানে না তিনি। পনের বছর আগে স্বামী মারা যাওয়ার পর প্রতি মাসে মাত্র চারশত টাকা করে বিধবা ভাতা পান তিনি। এ ভাতা দিয়েতো আর দিন কাটে না। তাই স্বামী ও নিজ নামীয় চার একর পাহাড়ী জমিতে বিভিন্ন ফসল উৎপাদন করে কোন মতে অনাহারে অর্ধাহারে জীবিকা নির্বাহ করছেন মুক্তিবাহিনীর সহযোদ্ধা এই জোহরা।

চার ছেলে দুই মেয়ে, ছেলেদের মধ্যে তিনজন দিন মুজরী করে জীবন চালায়। ছোট ছেলে হাফিজুর রহমান (শান্ত)। দুই মেয়ে বিবাহীত জীবন কাটাচ্ছে, দৈন্যদশায় থাকা ছেলেরা ও জামাতাদের সহযোগিতায় বেঁেচ আছেন এ নারী মুক্তিযোদ্ধা।

বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা পূনর্বাসন সোসাইটি কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিল-এর মাধ্যমে একজন সহযোদ্ধা তথা মুক্তিযুদ্ধা উত্তর সূরী হিসাবে রাষ্ট্রীয় অঙ্গীকার মতে বেঁেচ থাকার জন্য সামান্যতম সুযোগ সুবিধা দাবী করছেন মুক্তিযোদ্ধা জোহরা খাতুন।

তিনি সরকারের কাছে দাবী করে বলেন, সুযোগ-সুবিধার জন্য আমার স্বীকৃতি আর প্রয়োজন নেই। “অন্তত আমার ছোট ছেলেটির জীবনে যেন মুক্তিযোদ্ধা কৌটা নিশ্চিত হয়, আমি সে দাবী করছি সরকারের সংশ্লিষ্টদের কাছে”।

এ বিষয়ে বান্দরবান জেলা মুক্তিযোদ্ধা ডেপুটি কমান্ডার আবদুল আজিজ বলেন, একজন নারী মুক্তিযোদ্ধা হয়ে জোহরা খাতুন এখনো রাষ্ট্রীয় সুযোগ বঞ্চিত থাকার বিষয়টি সংশ্লিষ্টরা লজ্জা পাওয়া উচিত।

লামা উপজেলা নির্বাহী অফিসার নূর-এ-জান্নাত রুমি বলেন, জহুরা খাতুন মুক্তিযোদ্ধা তালিকাভুক্ত না হওয়ায় হয়তো সুযোগ সুবিধা পাচ্ছেন না। তাছাড়া তিনি এ বিষয়ে কোন অভিযোগও করেননি।

আরও পড়ুন

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না।