ছুটি এলেই বদলে যায় রাঙামাটির চেনা চেহারা। পাহাড়ের নীরবতা ভেঙে নামে মানুষের কোলাহল, কাপ্তাই লেকের নীল জলে সারি সারি টুরিস্ট নৌকার ছুটে চলা আর শহরের অলিগলিতে বাড়তি ব্যস্ততা জানান দেয়—ভ্রমণ মৌসুম শুরু। এবারও সাপ্তাহিক ও সরকারি ছুটিকে কেন্দ্র করে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে পর্যটকের ঢল নেমেছে পার্বত্য এই পর্যটন নগরীতে।
প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, পাহাড়ি পরিবেশ আর নিরিবিলি সময় কাটানোর সুযোগ—সব মিলিয়ে রাঙামাটি ভ্রমণ প্রেমীদের অন্যতম পছন্দের গন্তব্য। কাপ্তাই লেক, শুভলং ঝর্ণা, ঝুলন্ত সেতু, পলওয়েল পার্ক, রাজবন বিহার ও সাজেক সড়কজুড়ে বাড়তি যানবাহন ও মানুষের ভিড় চোখে পড়ছে।
পর্যটকের চাপে জেলার প্রায় সব হোটেল, মোটেল ও রিসোর্ট এখন প্রায় পূর্ণ। শহরের পাশাপাশি আশপাশের পর্যটন এলাকাগুলোতেও দেখা দিয়েছে আবাসিক সংকট। কাপ্তাই লেকে নৌভ্রমণে অংশ নিতে অনেক পর্যটককে অপেক্ষা করতে হচ্ছে দীর্ঘ সময়।
রাঙামাটি শহরের একটি আবাসিক হোটেলের ব্যবস্থাপক মো. জসিম উদ্দিন জানান, ছুটি শুরুর আগেই অধিকাংশ কক্ষ বুকড হয়ে যায়। পর্যটন খাত চাঙ্গা হওয়ায় সংশ্লিষ্টদের মধ্যে স্বস্তি ফিরেছে এবং এতে কর্মসংস্থানের সুযোগও বেড়েছে।
পর্যটক বাড়ায় স্থানীয় অর্থনীতিতেও পড়েছে ইতিবাচক প্রভাব। হোটেল-রেস্তোরাঁ, নৌভ্রমণ, পরিবহন, পাহাড়ি খাবার ও হস্তশিল্পের বাজারে বেড়েছে বেচাকেনা। দীর্ঘদিনের মন্দাভাব কাটিয়ে আবার ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ পাচ্ছেন পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর মানুষ।
হস্তশিল্প ব্যবসায়ী সুমন চাকমা বলেন, ছুটির মৌসুমে পর্যটক বাড়লে দোকানে ভিড়ও বাড়ে। বাঁশ, কাঠ ও পাহাড়ি পণ্যের বিক্রি ভালো হয়, যা পাহাড়ি মানুষের জীবন-জীবিকায় স্বস্তি আনে।

বাড়তি ভিড়ের কারণে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তৎপর প্রশাসন। কাপ্তাই লেকে নৌ-পুলিশ ও পর্যটন পুলিশের টহল জোরদার করা হয়েছে। নৌযানে লাইফ জ্যাকেট ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হয়েছে এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে জারি করা হয়েছে সতর্কতা।
রাঙামাটি ট্যুরিস্ট পুলিশের এসপি নিহাদ আদনান তাইয়ান জানান, পর্যটকদের নিরাপত্তাই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। নৌপথ ও পর্যটন স্পটগুলোতে সার্বক্ষণিক টহল অব্যাহত রয়েছে।
পর্যটকের চাপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিবেশ সুরক্ষার বিষয়টিও সামনে এসেছে। পাহাড় কাটা, লেক দূষণ ও যত্রতত্র ময়লা ফেলার আশঙ্কায় জেলা প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো সচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদার করেছে।
পর্যটকরাও রাঙামাটির প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে মুগ্ধ। ঢাকা থেকে আসা পর্যটক আরিফুল ইসলাম বলেন, রাঙামাটির পাহাড় ও লেকের সৌন্দর্য অনন্য। শহরের ব্যস্ততা ভুলে কিছুটা প্রশান্তি পেতেই এখানে আসা।
রাঙামাটি পর্যটন ও হলিডে কমপ্লেক্সের ব্যবস্থাপক অলোক বিকাশ চাকমা জানান, শীতকাল শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই পর্যটকের আনাগোনা বাড়তে থাকে। ডিসেম্বরজুড়ে আগাম বুকিংয়ের হার ৮০ শতাংশে পৌঁছেছে। জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে এই সংখ্যা আরও বাড়বে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
পর্যটকের এই বাড়তি চাপ সরকারের রাজস্ব আয়ে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলেও মন্তব্য করেন সংশ্লিষ্টরা।
সব মিলিয়ে ছুটির দিনে রাঙামাটি যেন নতুন করে প্রাণ ফিরে পেয়েছে। পর্যটনের এই চাঙাভাব স্থানীয় অর্থনীতিতে স্বস্তি আনলেও নিরাপত্তা ও পরিবেশ রক্ষায় সমন্বিত উদ্যোগই এখন সময়ের দাবি। পাহাড়-লেকের এই সৌন্দর্য রক্ষা করেই রাঙামাটি এগিয়ে যাক—এমন প্রত্যাশাই সবার।



