মাটিরাঙ্গায় বিদেশি জাতের আম বাগানে বাণিজ্যিক সাফল্য

পাহাড়ের বুকে সবুজের সমারোহ। সারি সারি আমগাছ, থোকায় থোকায় ঝুলছে বিচিত্র সব জাতের আম। খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গা উপজেলার পাহাড়ি ঢালে এখন এই দৃশ্য আর বিরল নয়। দেশি-বিদেশি উন্নত জাতের আম চাষ এখানে কেবল কৃষকের স্বপ্নই পূরণ করছে না, খুলে দিচ্ছে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির নতুন দ্বার।

কৃষি অফিসের তথ্যমতে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে উপজেলায় ৫৮২ হেক্টর জমিতে আমের আবাদ হয়েছে। উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত হয়েছে ৫,৮২০ মেট্রিক টন, যা গত বছরের (৩,৮১৭.৫ মেট্রিক টন) তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। উৎপাদিত আম বিক্রিতে ১৮ থেকে ২০ কোটি টাকা আয়ের সম্ভাবনা রয়েছে।

এবার আমের উৎপাদন আশাব্যঞ্জক হলেও, বিবিধ কারণে পাইকারি বাজারে এর প্রভাব পড়েছে; ফলে বিগত বছরগুলোর তুলনায় এবার আম বিক্রি হচ্ছে বেশ কম দামে।

চাষকৃত উল্লেখযোগ্য জাতগুলোর মধ্যে আম্রপালি সর্বোচ্চ ২৪০ হেক্টরে, সম্ভাব্য উৎপাদন ১,৯২০ মেট্রিক টন। মল্লিকা ৬০ হেক্টরে ৩৬০ মেট্রিক টন, বারি-৪, ৮৫ হেক্টরে ২৫৫ মেট্রিক টন এবং গুটি আম ৭৫ হেক্টরে ৫৬২.৫ মেট্রিক টন উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। বিদেশি জাতের মধ্যে কাটিমন ও কিউজাই প্রতি হেক্টরে ৮ মেট্রিক টন ফলন দিচ্ছে, যা কৃষকদের মধ্যে বিশেষ আগ্রহ তৈরি করেছে।

উপজেলার দক্ষিণ মুসলিমপাড়ায় প্রায় পাঁচ একর পাহাড়ি জমির ওপর গড়ে উঠেছে উদ্যোক্তা মো. ফোরকান উদ্দিনের এক ব্যতিক্রমধর্মী আম বাগান। চট্টগ্রামের এই তরুণ উদ্যোক্তা বিদেশের মালয়েশিয়ার

ভিক্টোরিয়া ইন্টারন্যাশনাল কলেজ থেকে কুলিনারি আর্টসে ডিগ্রি নিয়ে ব্যবসার সূত্রে পাহাড়ে আসেন। এরপরই কৃষির প্রতি জন্মায় গভীর টান।

২০২৩ সালের জুন মাসে মায়ের শখকে বাস্তবে রূপ দিতে তিনি শুরু করেন এই বাগানের যাত্রা। আজ সেই বাগানে শোভা পাচ্ছে প্রায় দুই হাজার আমগাছ এবং দেশি-বিদেশি মিলিয়ে ৪০টিরও বেশি জাতের আম।

বাণিজ্যিকভাবে চাষ হচ্ছে বারি-৪, (গৌরমতি), বানানা ম্যাঙ্গো, আম্রপালি, বারি-১১, কাটিমনসহ বহু জনপ্রিয় জাত। পাশাপাশি রয়েছে মিয়াজাকি (সূর্যডিম), আলফানসো, ব্রুনাই কিং, রেড পালমার, ব্ল্যাক স্টোনের মতো বিরল ও উচ্চমূল্যের বিদেশি জাতও। চলতি মৌসুমে তিনি ইতোমধ্যে বিক্রি করেছেন প্রায় ১০ টন আম।

NewsDetails_03

শখ কীভাবে আজ সফল বাণিজ্যিক উদ্যোগে পরিণত হয়েছে, তা তুলে ধরে ফোরকান উদ্দিন বলেন, “শুরুটা হয়েছিল কেবলই শখ থেকে, যা আজ বড় এক বাণিজ্যিক সম্ভাবনা জাগিয়েছে। আমাদের পাহাড়ের মাটি আর জলবায়ু বিদেশি জাতের আম চাষের জন্য এক দারুণ আশীর্বাদ। সঠিক উপায়ে আম গাছের পরিচর্যা আর আধুনিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে পারলে এই পাহাড় থেকেই দারুণ সাফল্য ও ভালো লাভ ঘরে তোলা সম্ভব।”

একই এলাকার বাগান মালিক নুরুল ইসলাম বলেন, “আগে পাহাড়ি জমি বছরের পর বছর অনাবাদি পড়ে থাকত। এখন আমসহ বিভিন্ন ফলের চাষ করে কৃষকরা লাভবান হচ্ছেন। সরকারি সহযোগিতা আরও বাড়লে পাহাড়ে আম চাষে রীতিমতো বিপ্লব ঘটবে।”

বাগানে কর্মরত শ্রমিক মো. আবদুল হামিদ তাঁর সন্তুষ্টি প্রকাশ করে বলেন, “এই বাগানের কল্যাণে এখন আমরা সারা বছরই কাজের সুযোগ পাচ্ছি। এতে আমাদের পারিবারিক আয় যেমন বেড়েছে, তেমনি জীবনযাত্রাও অনেক সহজ হয়েছে।”

​একই অনুভূতি প্রকাশ করলেন আরেক শ্রমিক মো. রফিকুল ইসলাম। নিজের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, “আগে কাজের সন্ধানে আমাদের দূর-দূরান্তে ছুটে বেড়াতে হতো। কিন্তু এখন ঘরের কাছে নিজের এলাকাতেই সারা বছর নিশ্চিত কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়েছে।”

মাটিরাঙ্গা উপ-সহকারি কৃষি কর্মকর্তা দেবাশীষ চাকমা জানান, “চলতি মৌসুমে অনুকূল আবহাওয়া ও কৃষি বিভাগের নিয়মিত পরামর্শের কারণে আমের বাম্পার ফলন হয়েছে। তবে উৎপাদন বৃদ্ধি পাওয়ায় বাজারে সরবরাহও বেড়েছে, যার প্রভাব দামে পড়েছে। কৃষকরা যাতে লাভজনক মূল্য পান, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।”

মাটিরাঙ্গা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. সাহাবুদ্দিন আহমেদ অঞ্চলের সম্ভাবনা তুলে ধরে বলেন, “পাহাড়ি অঞ্চলের মাটি ও জলবায়ু আম চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। কৃষকদের দক্ষতা বৃদ্ধিতে আমরা নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও কারিগরি সহায়তা দিয়ে যাচ্ছি। উন্নত জাতের আমের পরিকল্পিত চাষ সম্প্রসারণ করা গেলে, ভবিষ্যতে মাটিরাঙ্গাকে দেশের অন্যতম প্রধান আম উৎপাদনকারী অঞ্চল হিসেবে গড়ে তোলা সম্পূর্ণ সম্ভব।”

​তিনি আরও উল্লেখ করেন, “বর্তমানে দেশি জাতের পাশাপাশি উচ্চমূল্যের বিদেশি জাতের আম চাষে কৃষকদের আগ্রহ দিন দিন বাড়ছে, যা সামগ্রিকভাবে স্থানীয় অর্থনীতিতে এক ইতিবাচক পরিবর্তনের হাওয়া বইয়ে দিচ্ছে।”

মাটিরাঙ্গার পাহাড়ি জনপদে আম চাষের এই বিস্তার কেবল কৃষকের মুখে হাসি ফোটাচ্ছে না সৃষ্টি হচ্ছে কর্মসংস্থান, জাগছে নতুন অর্থনীতির স্পন্দন। পাহাড়ের মাটি আর মানুষের পরিশ্রম মিলে এখানে রচিত হচ্ছে এক সবুজ সাফল্যের আখ্যান।

আরও পড়ুন