দীপেন দেওয়ানের নেতৃত্বে পাহাড়, পাশে মীর হেলাল
পার্বত্য রাজনীতিতে সূচিত হলো নতুন এক অধ্যায়। এই প্রথমবারের মতো পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে পূর্ণাঙ্গ মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন রাঙামাটির কৃতী সন্তান এ্যাড. দীপেন দেওয়ান। তাঁর পাশাপাশি প্রতিমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন। সরকারের এই সিদ্ধান্তকে সংশ্লিষ্টরা পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজনৈতিক ভারসাম্য ও অংশীদারিত্বমূলক শাসনের এক তাৎপর্যপূর্ণ বার্তা হিসেবে দেখছেন।
দীর্ঘদিন ধরে মন্ত্রণালয়টিতে একক নেতৃত্বের চর্চা থাকলেও এবার মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী, দু’জনের সমন্বিত দায়িত্ব বণ্টন প্রশাসনিক কার্যক্রমে গতি ও জবাবদিহিতা বাড়াবে বলে মনে করা হচ্ছে। বিশেষ করে পাহাড়ের বহুজাতিক ও বহুসাংস্কৃতিক বাস্তবতায় উভয় সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত হওয়ায় উন্নয়ন, সম্প্রীতি ও আস্থার রাজনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে আশা করছেন বিশ্লেষকরা।
১৯৯৭ সালে স্বাক্ষরিত পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তি দীর্ঘ সশস্ত্র সংঘাতের অবসান ঘটিয়ে রাজনৈতিক সমাধানের দ্বার উন্মুক্ত করে। এর ধারাবাহিকতায় গঠিত হয় পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ এবং জেলা পরিষদ কাঠামো। তবে চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন, ভূমি কমিশনের কার্যকারিতা, প্রশাসনিক সমন্বয় ও প্রতিনিধিত্বের ভারসাম্য নিয়ে আলোচনা কখনও থেমে থাকেনি।
সুশীল সমাজের অনেকে মনে করছেন, নতুন এই যৌথ নেতৃত্ব দীর্ঘদিনের বঞ্চনা, উন্নয়ন বৈষম্য ও সংবেদনশীল আঞ্চলিক ইস্যুগুলো মোকাবেলায় কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ করে ভূমি সমস্যার স্থায়ী সমাধান, অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে দৃশ্যমান অগ্রগতি এখন সময়ের দাবি।

রাঙামাটি প্রেস ক্লাব এর সভাপতি আনোয়ার আল হক বলেন, পাহাড়ে দীর্ঘদিন ধরে যে আস্থার ঘাটতি রয়েছে, তা দূর করতে সমন্বিত নেতৃত্ব প্রয়োজন। প্রতিমন্ত্রী যদি সব পক্ষের সঙ্গে নিয়মিত সংলাপ করেন, তবে ইতিবাচক পরিবর্তন সম্ভব।
সুশীল সমাজের প্রতিনিধি মনিরুজ্জামান মহসীন রানা বলেন, পার্বত্য মন্ত্রণালয়ে উভয় সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত হওয়ায় শান্তি-সম্প্রীতির নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে এবং সকল জনগোষ্ঠীর অধিকার প্রতিষ্ঠার পথে এক ইতিবাচক অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে। তবে তিনি সতর্ক করে দেন, পার্বত্য অঞ্চলের সংবেদনশীল বাস্তবতা বিবেচনায় শান্তিচুক্তির ধারাগুলোর পূর্ণ বাস্তবায়ন, দীর্ঘদিনের ভূমি সমস্যার টেকসই সমাধান এবং ন্যায়ভিত্তিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
পার্বত্য চট্টগ্রাম নাগরিক পরিষদ রাঙামাটি জেলা শাখার সভাপতি মোহাম্মদ সোলায়মান বলেন, তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নবগঠিত সরকার পার্বত্য চট্টগ্রাম মন্ত্রণালয়ে প্রথমবারের মতো দুজন মন্ত্রী নিয়োগ করেছে। একজন উপজাতীয় পূর্ণ মন্ত্রী এবং একজন বাঙালি জনগোষ্ঠী থেকে প্রতিমন্ত্রী দেওয়ার ফলে পার্বত্য চট্টগ্রামে সকল জনগোষ্ঠীর ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা হয়েছে। আমরা মনে করি, এই উদ্যোগ পার্বত্য মন্ত্রণালয়কে প্রকৃতপক্ষে পার্বত্যবাসীর উন্নয়ন, স্থায়ী শান্তি ও সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠায় কাজে লাগবে।
বিশ্লেষকদের মতে, এটি কেবল প্রশাসনিক পদক্ষেপ নয় বরং পার্বত্য অঞ্চলে অংশীদারিত্বমূলক শাসনব্যবস্থার একটি প্রতীকী রূপান্তর। নতুন সমন্বয়ের মাধ্যমে যদি কার্যকর নীতি-বাস্তবায়ন, স্বচ্ছতা ও নিয়মিত সংলাপ নিশ্চিত করা যায়, তবে পাহাড়ে দীর্ঘ প্রতীক্ষিত স্থিতিশীলতা ও টেকসই উন্নয়নের পথ আরও সুদৃঢ় হতে পারে।
এখন দেখার বিষয় দুই নেতার এই যৌথ নেতৃত্ব পার্বত্য চট্টগ্রামের বাস্তব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় কতটা কার্যকর হয়ে ওঠে এবং পাহাড়বাসীর প্রত্যাশা কতটা পূরণ করতে সক্ষম হয়।



