পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের প্রকল্পে অযৌক্তিক ভাবে পরামর্শক নিয়োগের অভিযোগ

প্রকল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা

পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের টেকসই সামাজিক সেবা প্রদান প্রকল্প (২য় পর্যায়) এ একতরফাভাবে পরামর্শক নিয়োগ ও অযৌক্তিক ডিপিপি প্রনয়নের অভিযোগ উঠেছে।

ফ্যাসিস্ট সরকারের সুবিধাভোগী প্রকল্পের সাবেক কর্মকর্তা ইয়াছিনুল হককে উচ্চ বেতন সম্পন্ন পরামর্শক পদে নিয়োগ দেয়ার তোড়জোর চলছে বলে অভিযোগ করেন প্রকল্পের সাবেক ও বর্তমান কর্মচারীরা। প্রকল্পের চলমান আর্থিক দৈনতার মাঝে একজন কর্মকর্তার বিলাসিতার জন্য উচ্চ বেতনের পরামর্শক নিয়োগ দেয়া হলে প্রকল্পটিতে আরো অচলাবস্থা দেখা দিবে। এ নিয়ে প্রকল্পের কর্মকর্তা, কর্মচারী ও পুরো উন্নয়ন বোর্ড জুরে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। অযৌক্তিক এবং অনিয়মের মাধ্যমে পরামর্শক নিয়োগ প্রক্রিয়া বাতিলের দাবিতে সম্প্রতি বোর্ড চেয়ারম্যান বরাবর আবেদন করেছেন প্রকল্পের সাবেক ও বর্তমান কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা।

অভিযোগে বলা হয়, প্রকল্পের সাবেক ব্যবস্থাপক ইয়াছিনুল হক নিজের স্বার্থ রক্ষা ও আর্থিক সুবিধা নিতে মনগড়াভাবে প্রকল্পের ডিপিপিতে পরামর্শক পদ সৃজন করেছেন। ওই পদর নিজের নিয়োগ নিশ্চিত করতে কৌশলে তার নিজের যোগ্যতার সাথে সমন্বয় রেখে মনগড়া শর্ত দিয়ে নিয়োগ বিজ্ঞাপন দিয়েছেন। এতে অন্যান্য নিয়োগ প্রার্থীরাও বঞ্চিত হয়েছেন।

জানাগেছে, অভিযুক্ত মোঃ এয়াছিনুল হক বিগত ফ্যাসিষ্ট সরকারের প্রভাবশালী মন্ত্রী হাসান মাহমুদ ও এমপি ফজলে করিম এর সুপারিশে এ প্রকল্পে প্রকল্প ব্যবস্থাপক পদে নিয়োগ পেয়েছিলেন। ২০২৩ সালের জুন মাসে প্রকল্পের ১ম পর্যায়ের মেয়াদ শেষ হলে ২য় পর্যায়ের ডিপিপি তৈরী করেন সাবেক এ প্রকল্প ব্যবস্থাপক। অভিযোগ উঠেছে বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের সুবিধাভোগী এ কর্মকর্তা একতরফা, অযৌক্তিক ও ক্রয় নির্ভর ডিপিপি প্রনয়ন করেছেন। যা তিনি পরবর্তিতে অন্তবর্তী সরকারের সময়ে পাশ করিয়ে নেন। ক্রয় নির্ভর ডিপিপিতে ব্যাপক আর্থিক অনিয়মের সুযোগ রয়েছে। অপরদিকে ক্রয়খাতে বাজেট বেড়ে যাওয়ায় আর্থিক সংকুলান না হওয়ায় কমিয়ে ফেলা হয়েছে প্রকল্পের মূল চালিকাশক্তি মাঠ পর্যায়ে পাড়াকর্মী ও মাঠ সংগঠকদের সম্মানী ভাতা। পূর্বের চেয়ে এক-তৃতীয়াংশ বেতন ভাতা কমিয়ে দেয়ায় গত ১০ মাসে দুই শতাধিক কর্মচারী, কর্মকর্তা চাকরি ছেড়েছেন। এতে প্রকল্পের মৌলিক কার্যক্রমে ব্যাপক ব্যাঘাত সৃষ্টি হয়েছে।

প্রকল্পের এ অবস্থায় উচ্চ বেতনের পরামর্শক পদে নিয়োগ দেওয়া এক প্রকার বিলাসিতা এবং নির্দিষ্ট ব্যক্তি মোঃ এয়াছিনুল হক’কে পরামর্শক পদে নিয়োগের জন্য বিশেষ সুযোগের ব্যবস্থা করা কেবলমাত্র দুর্নীতিই নয়, এক প্রকার অপরাধের সামিল বলে মতব্যক্ত করেন সচেতন মহল।

খবর নিয়ে জানা গেছে, গত ২৪ মে বিতর্কিত ও একতরফাভাবে পরামর্শক নিয়োগের পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। যেখানে সাবেক প্রকল্প ব্যবস্থাপক ইয়াছিনুল হক ছিলেন একক প্রার্থী। সরকারী নিয়োগ বিধিমালা উপেক্ষা করে একক প্রাথী দিয়ে নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে।

এদিকে বাস্তবতা উপেক্ষা করে মনগড়া ও অযৌক্তিক ডিপিপি তৈরীর ফলে সম্ভাবনাময় প্রকল্পটি মুখ থুবড়ে পড়ার উপক্রম বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্টরা। ডিপিপিতে প্রকল্পের মৌলিক কার্যক্রমে ও উন্নয়ন খাতে বরাদ্দ কমিয়ে ক্রয় খাতে বরাদ্দ বাড়ানোয় প্রকল্পটিতে আর্থিক সংকট সহ নানা জটিলতা তৈরি হয়েছে। প্রকল্পের প্রায় পাঁচ হাজার কর্মকর্তা ও কর্মচারীর আর্থিক অনিশ্চয়তায় ভুগছেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে এ অবস্থা চলতে থাকলে প্রকল্পটি মেয়াদ শেষের আগেই মাঠে মারা যেতে পারে।
সংশ্লিষ্ট সুত্র জানায়, টেকসই সামাজিক সেবা প্রদান-২য় পর্যায় প্রকল্পটি ২০২৪ সালের অক্টোবর হতে শুরু হয়েছে। পূর্বে ১৯৮০ সাল হতে এটি সমন্বিত সমাজ উন্নয়ন প্রকল্প নামে পরিচিত ছিল।
আন্তর্জাতিক সংস্থা ইউনিসেফের সহযোগিতায়

NewsDetails_03

কোন পরামর্শক পদ ছাড়াই বোর্ডের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা ও পরিচালনায় প্রকল্পটি সুনামের সাথে কার্যক্রম বাস্তবায়ন করেছে। এর আগে এ প্রকল্পে পরামর্শক নিয়োগের প্রস্তাবনা করা হলেও সরকার অর্থ অপচয় রোধে অপ্রয়জোনীয় পরামর্শক পদের প্রস্তাবনা নাকচ করে দেন। কিন্তু সকল নিয়ম ও বাস্তবতাকে পাশ কাটিয়ে এবং অতীতের রেকর্ড ভঙ্গ করে বর্তমানে চলমান টেকসই সামাজিক সেবা প্রদান-২য় পর্যায়ের ডিপিপিতে পরামর্শক পদ সৃজন করেন সাবেক প্রকল্প ব্যবস্থাপক মো: এয়াছিনুল হক। শুধু তাই নয় একতরফাভাবে নীতি বহির্ভুত নিয়োগের শর্তাবলী সন্নিবেশ করে কেবলমাত্র নিজে নিয়োগ পাওয়ার ব্যবস্থাও করেছেন তিনি।

পরামর্শক নিয়োগের বিজ্ঞাপ্তিতে দেখা গেছে, সাবেক প্রকল্প ব্যবস্থাপক যে বিষয়টি (সমাজতত্ত্ব) অধ্যয়ন করেছেন কেবলমাত্র সেই বিষয়টি (সমাজতত্ত্ব) শিক্ষাগত যোগ্যতার একমাত্র মানদ- হিসেবে নিয়োগ শর্তাবলীতে উল্লেখ রয়েছে। এছাড়াও আবেদনের বয়সসীমা সর্বনিন্ম ৫৬ বৎসর এবং অভিজ্ঞতা ২৪ বছর করা হয়েছে কেবলমাত্র নিজের যোগ্যতার সাথে হুবহু মিল রেখে, যাতে তিনি ছাড়া অন্য কেউ উক্ত পরামর্শক পদে আবেদন/অংশগ্রহণ করতে না পারে। এতে প্রকল্পের বর্তমান এবং বোর্ডের সাবেক ও বিভিন্ন প্রকল্পের অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়।

এদিকে প্রকল্পের ডিপিপি পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, বর্তমান ২য় পর্যায় প্রকল্পে মানবসম্পদ উন্নয়ন, যথাযথ প্রশিক্ষণ, প্রয়োজনীয় ওয়ার্কশপ, মা ও শিশু সুরক্ষার্থে মাঠ সংগঠক ও পাড়াকর্মীদের (প্রায় ৯৮%) মাতৃত্বকালীন ছুটি না রাখাসহ বিষয়গুলো প্রাধান্য না দিয়ে ক্রয়/টেন্ডার কেন্দ্রিক উচ্চমূল্যের বরাদ্দ রাখা হয়েছে। যার মাধ্যমে অর্থ লুটের ব্যবস্থা করা হয়েছে। অভিযোগ আছে, গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি কার্যক্রম বাস্তবায়নে প্রায় ৪ হাজারের অধিক পাড়াকেন্দ্রের জন্য উচ্চমূল্য নির্ধারণ করে নিন্ম মানের মালামাল ক্রয় করা হয়েছে। অথচ উক্ত কার্যক্রম বাস্তবায়নে মাঠ পর্যায়ে পাড়াকর্মীদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা রাখা হয়নি। সকল পাড়াকেন্দ্রে পূর্বে বিভিন্ন রেজিস্টার পর্যাপ্ত মজুদ থাকা সত্ত্বেও পুনরায় প্রত্যেকটি পাড়াকেন্দ্রের জন্য বিভিন্ন রেজিস্টার ক্রয়, উচ্চমূল্য নির্ধারণ করে মাঠ-সংগঠক, পাড়াকর্মী ও পাড়াকেন্দ্রের শিশুদের জন্য নিন্ম মানের পোশাক ক্রয়, প্রথম পর্যায় প্রকল্পের মাঠ পর্যায়ের উপজেলা অফিসগুলোতে ফার্নিচার ও বিভিন্ন মালামাল পর্যাপ্ত থাকা সত্ত্বেও অযৌক্তিকভাবে ফার্নিচার ও বিভিন্ন মালামাল ক্রয়ে বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

এদিকে ক্রয় খাতে বরাদ্দ বাড়ানোয় কমানো হয়েছে প্রকল্পের মূল চালিকা শক্তি প্রায় ৫ হাজার কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বেতন ভাতা।

ইতোমধ্যে প্রকল্প শুরুর এক বছরের মধ্যে সরকারি বরাদ্দ কম প্রাপ্তির অজুহাতে পূর্বের চেয়ে ভাতা কমিয়ে দেওয়ায় বেশকিছু মাঠ-সংগঠকসহ প্রায় ২ শতাধিক পাড়াকর্মী পদত্যাগ করেছেন। রাঙামাটি সদরের মাঠ সংগঠক ইন্দ্রাণী চাকমা বলেন, বেতন কমে যাওয়ায় আমাদের চরম কষ্টে জীবন যাপন করতে হচ্ছে। অনেকে চাকরি ছেড়েছেন।

প্রকল্পের ১ম পর্যায়ের পাড়া কর্মী আয়শা আক্তার বেতন কমে যাওয়ায় প্রকল্পের ২য় পর্যায়ে আর যোগ দেননি। তিনি বলেন, যেখানে বেতন বাড়ার কথা সেখানে উল্টো কমানো হয়েছে। দ্রব্যমূল্যের উর্ধগতির বাজারে কম বেতনে চলা সম্ভব না।

অভিজ্ঞ মহল মনে করেন অযৌক্তিক, অদূরদর্শি ও একপেশে ডিপিপি প্রণয়নের কারণে দীর্ঘ ৪৫ (পঁয়তাল্লিশ) বছরের প্রকল্পটি বর্তমানে মুখ থুবড়ে পড়ার উপক্রম হয়েছে। প্রকল্প মেয়াদ শেষ হওয়ার পূর্বেই প্রকল্পটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকার মা ও শিশুদের অধিকার, নারীর ক্ষমতায়ন, আর্থ-সামাজিক অবস্থার অগ্রগতি, নারী ও শিশুদের মৌলিক সেবা ইত্যাদি সুবিধা থেকে বঞ্চিত হবে। যা সরকারের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বাধাগ্রস্ত হবে।

এসব বিষয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের ভাইস চেয়ারম্যান ‌শেখ ছা‌লেহ আহাম্মদ বলেন, প্রকল্প চলে ডিপিপি অনুযায়ী যা ইতোপূর্বে একনেকে পাশ হয়েছে। ডিপিপির বাইরে বোর্ডের আর কিছু করার থাকে না বলে তিনি জানান।

এ বিষয়ে প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্বে থাকা পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের সদস্য (প্রশাসন) জাহিদ ইকবালের সাথে তাঁর মুঠোফোনে বার বার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
একইভাবে প্রকল্প ব্যাবস্থাপক মংছেলাইন রাখাইনের মুঠোফোনেও বার বার চেষ্টা করে সংযোগ স্থাপন করা যায়নি।

আরও পড়ুন